ইসলামে বিবাহ শুধু একটি সামাজিক সম্পর্ক নয়; এটি দায়িত্ব, অধিকার, ভালোবাসা ও আমানতের একটি চুক্তি। স্বামী ও স্ত্রী দুজনই এই সম্পর্কের অংশীদার এবং উভয়ের ওপরই কিছু দায়িত্ব রয়েছে। কুরআন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের ভিত্তিতে দেখিয়েছে এবং দাম্পত্য জীবনে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
অর্থাৎ, নারীদেরও ন্যায়সংগতভাবে তেমন অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে। — সূরা আল-বাকারা, ২:২২৮
অন্যদিকে আল্লাহ দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও রহমতের কথা বলেছেন:
وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
অর্থাৎ, তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। — সূরা আর-রূম, ৩০:২১
তাই ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে শুধু কে কার ওপর কর্তৃত্ব করবে—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। বরং প্রত্যেকের নিজের দায়িত্ব পালন এবং অন্যের প্রাপ্য অধিকার রক্ষা করাই দাম্পত্য জীবনের মূল বিষয়।
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি
কুরআনের ভাষায় বিবাহের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও রহমত সৃষ্টি হওয়া।
এ কারণে দাম্পত্য জীবনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ:
একে অপরের প্রতি সম্মান
বৈধ অধিকার আদায় করা
অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকা
ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখা
পারিবারিক দায়িত্বে সহযোগিতা করা
মতবিরোধ হলে ন্যায়সংগত সমাধান খোঁজা
কুরআন স্বামীদের নির্দেশ দিয়েছে স্ত্রীদের সঙ্গে মারুফ, অর্থাৎ প্রচলিত ন্যায়সংগত ও উত্তম আচরণে বসবাস করতে। — সূরা আন-নিসা, ৪:১৯
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রধান দায়িত্ব
১. ভরণপোষণ করা
হানাফি ফিকহে বৈধ বিবাহের পর স্ত্রীর নাফাকা বা ভরণপোষণ স্বামীর ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এর মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার, পোশাক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত।
মুখতাসারুল কুদুরিতে স্ত্রীকে নাফাকা, পোশাক ও বাসস্থান দেওয়ার দায়িত্ব স্বামীর ওপর উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর পরিমাণ স্বামী-স্ত্রীর আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বলা হয়েছে।
কুরআনেও ব্যয়ের ক্ষেত্রে সামর্থ্য বিবেচনার নির্দেশ এসেছে:
لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ
অর্থাৎ, সচ্ছল ব্যক্তি তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করবে; আর যার রিজিক সীমিত, সে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করবে। — সূরা আত-তালাক, ৬৫:৭
২. উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করা
হানাফি ফিকহে স্ত্রীর জন্য উপযুক্ত ও ব্যক্তিগত বাসস্থানের অধিকার রয়েছে। মুখতাসারুল কুদুরিতে স্ত্রীর জন্য এমন পৃথক বাসস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে স্বামীর পরিবারের অন্য সদস্যরা বসবাস না করেন, যদি স্ত্রী নিজে তাদের সঙ্গে বসবাসে সম্মত না হন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকা অনেক সমাজে প্রচলিত হলেও, কোনো সামাজিক রীতিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়তের বাধ্যতামূলক বিধান বলা যাবে না।
৩. স্ত্রীর সঙ্গে ভালো আচরণ করা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে ঈমানে অধিক পরিপূর্ণ সে, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা তাদের স্ত্রীদের প্রতি উত্তম।”
জামে তিরমিজি, ১১৬২; ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন।
অতএব, স্ত্রীর ভরণপোষণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সম্মানজনক কথা বলা, অকারণে অপমান না করা এবং দাম্পত্য জীবনে উত্তম চরিত্র প্রদর্শনও গুরুত্বপূর্ণ।
৪. স্ত্রীর অধিকার নষ্ট না করা
রাসুলুল্লাহ ﷺ স্ত্রীদের খাদ্য ও পোশাকের অধিকার উল্লেখ করেছেন এবং মুখে আঘাত করা ও অপমানজনক কথা বলতে নিষেধ করেছেন। — সুনান আবু দাউদ, ২১৪২
এ ছাড়া আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ কোনো নারী বা খাদেমকে নিজ হাতে আঘাত করেননি। সহিহ মুসলিম, ২৩২৮a
তাই দাম্পত্য বিরোধকে নির্যাতনের অজুহাত বানানো ইসলামের নববী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
স্বামীর প্রতি স্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব
১. বৈধ বিষয়ে স্বামীর সহযোগিতা ও আনুগত্য
কুরআন ৪:৩৪-এ পরিবারের দায়িত্ব ও স্বামীর ওপর আরোপিত ব্যয়ের সঙ্গে স্ত্রীর বৈধ আনুগত্য ও স্বামীর অনুপস্থিতিতে আমানত রক্ষার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আনুগত্যের অর্থ এই নয় যে স্বামী যা বলবেন, তা যেকোনো পরিস্থিতিতে পালন করতে হবে। শরিয়তবিরোধী কাজে কারও আনুগত্য করা বৈধ নয়। তাই স্বামীর অধিকারকে আল্লাহর বিধানের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না।
২. স্বামীর অনুপস্থিতিতে আমানত রক্ষা করা
স্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ, সংসার ও পারিবারিক গোপনীয়তা যথাসম্ভব রক্ষা করা অন্তর্ভুক্ত।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
হাদিসে পুরুষকে তার পরিবারের দায়িত্বশীল এবং নারীকে স্বামীর ঘর ও সন্তানদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল বলা হয়েছে। - সহিহ বুখারি, ৭১৩৮
৩. স্বামীর বৈধ অধিকার রক্ষা করা
বিবাহের মাধ্যমে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই কিছু বৈধ দাম্পত্য অধিকার সৃষ্টি হয়। তাই উভয়ের উচিত অন্যের বৈধ অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া এবং অকারণে তা নষ্ট না করা।
একই সঙ্গে অসুস্থতা, বাস্তব অক্ষমতা, ক্ষতি বা বিশেষ পরিস্থিতির মতো বিষয় থাকলে নির্দিষ্ট ফিকহি বিধান আলাদা হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনায় যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার
ভালো ব্যবহার
স্বামী যেমন স্ত্রীর সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন, স্ত্রীও স্বামীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করবেন। কুরআনের “মারুফ” নীতি উভয়ের দাম্পত্য আচরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
পারস্পরিক মানসিক সহযোগিতা
কুরআন দাম্পত্য সম্পর্ককে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও রহমতের সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করেছে। — সূরা আর-রূম, ৩০:২১
তাই সংসারে শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়; অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, সন্তান প্রতিপালন এবং পারিবারিক সমস্যায় একে অপরকে সহযোগিতা করাও বাস্তব দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা
স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় বন্ধু, আত্মীয় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত নয়। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনের গোপন বিষয় ছড়িয়ে দেওয়া সম্পর্কের আমানত ও পারস্পরিক আস্থার ক্ষতি করতে পারে।
সম্পদের স্বাতন্ত্র্য
বিবাহ হলেই স্বামী ও স্ত্রীর পৃথক মালিকানাধীন সম্পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একে অপরের সম্পদ হয়ে যায় না। হানাফি ফিকহের আলোচনায় স্বামী ও স্ত্রীর পৃথক সম্পত্তির মালিকানা স্বীকৃত।
অতএব, স্ত্রীর নিজের উপার্জন, উত্তরাধিকার বা বৈধ মালিকানাধীন সম্পদকে স্বামী তার অনুমতি ছাড়া নিজের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন না। একইভাবে স্ত্রীরও স্বামীর সম্পদের ওপর তার অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
স্বামীর আনুগত্যের ক্ষেত্রে ইসলামের সীমা
স্বামীর বৈধ নির্দেশ ও পারিবারিক অধিকারের প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব রয়েছে। তবে এই আনুগত্য শরিয়তসম্মত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
উদাহরণস্বরূপ, স্বামী যদি কোনো ফরজ ইবাদত ছেড়ে দিতে বলেন বা স্পষ্ট হারাম কাজে নির্দেশ দেন, সেই নির্দেশ পালন করা যাবে না।
অন্যদিকে স্ত্রীও নিজের পছন্দকে অজুহাত বানিয়ে স্বামীর সব বৈধ অধিকার অস্বীকার করতে পারেন না।
অর্থাৎ, দাম্পত্য জীবনে অধিকার ও দায়িত্ব—দুটিই ভারসাম্যের সঙ্গে বুঝতে হবে।
স্বামী কি স্ত্রীর সব সম্পদের মালিক?
না। বিবাহের কারণে স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদের মালিকানা স্বামীর কাছে স্থানান্তরিত হয় না।
হানাফি ফিকহের আলোচনায় স্বামী ও স্ত্রীর সম্পদকে পৃথক মালিকানার অধীনে ধরা হয়েছে।
তাই স্ত্রীর উত্তরাধিকার, উপহার, ব্যবসা বা নিজস্ব বৈধ উপার্জন তার সম্পদ। স্বামী-স্ত্রী চাইলে পারস্পরিক সম্মতিতে অর্থ ব্যয় বা যৌথ সম্পদ তৈরি করতে পারেন, কিন্তু শুধু বিবাহিত হওয়ার কারণে একজনের সম্পদ অন্যজনের হয়ে যায় না।
শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা কি স্ত্রীর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব?
এ বিষয়ে সামাজিক রীতি ও ফিকহি দায়িত্বকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
শ্বশুর-শাশুড়ির সম্মান করা, ভালো আচরণ করা এবং প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করা অবশ্যই উত্তম। কিন্তু তাদের সেবা করার প্রতিটি সামাজিক প্রত্যাশাকে স্ত্রীর স্বতন্ত্র শরিয়তি দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করার আগে নির্দিষ্ট ফিকহি বিধান যাচাই করতে হবে।
বিশেষ করে পৃথক বাসস্থানের বিষয়ে হানাফি গ্রন্থে স্ত্রীর ব্যক্তিগত বাসস্থানের অধিকার উল্লেখ করা হয়েছে।
দাম্পত্য জীবনে বিরোধ হলে কী করা উচিত?
প্রথমে স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যে শান্তভাবে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। ব্যক্তিগত বিষয়কে অপ্রয়োজনে আত্মীয়স্বজন বা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সমস্যাকে আরও জটিল করতে পারে।
সমাধান সম্ভব না হলে কুরআন উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে সালিশ নিযুক্ত করার কথা বলেছে:
“তোমরা যদি উভয়ের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে একজন সালিশ তার পরিবার থেকে এবং একজন সালিশ তার পরিবার থেকে নিযুক্ত করো। তারা উভয়ে সংশোধন চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিল সৃষ্টি করবেন।”
সূরা আন-নিসা, ৪:৩৫
অতএব, গুরুতর দাম্পত্য বিরোধে ন্যায়পরায়ণ ও বিচক্ষণ ব্যক্তির মধ্যস্থতা গ্রহণ করা ইসলামের নির্দেশনার অংশ।
কুরআন ৪:৩৪ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
স্বামী-স্ত্রীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সূরা আন-নিসা ৪:৩৪-এর শেষাংশ নিয়ে অনেক সময় অসম্পূর্ণ বা একপেশে বক্তব্য দেওয়া হয়।
আয়াতটিতে পারিবারিক অবাধ্যতা বা নুশূয-এর পরিস্থিতিতে ধারাবাহিক কিছু পদক্ষেপের কথা এসেছে। একই আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি সংশোধিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো পথ খোঁজা যাবে না।
এ আয়াতকে স্বামীর জন্য সাধারণভাবে স্ত্রীকে নির্যাতন করার অনুমতি হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিজের দাম্পত্য আচরণ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। আয়িশা (রা.) বলেছেন, তিনি কোনো নারী বা খাদেমকে আঘাত করেননি।
এই আয়াতের ফিকহি বিস্তারিত ব্যাখ্যা আলাদা একটি আলোচনার বিষয় এবং বিভিন্ন তাফসির ও ফিকহি গ্রন্থে এর শর্ত ও সীমা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তাই এ বিষয়ে আবেগনির্ভর বা অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যার পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য আলেমের ব্যাখ্যা অনুসরণ করা উচিত।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
ভুল ধারণা ১: স্বামী সংসারের কর্তা, তাই তার কোনো জবাবদিহি নেই
এটি সঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। - সহিহ বুখারি, ৭১৩৮
ভুল ধারণা ২: স্ত্রীর শুধু দায়িত্ব আছে, কোনো অধিকার নেই
কুরআন সরাসরি বলেছে, নারীদেরও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে। -- সূরা আল-বাকারা, ২:২২৮
ভুল ধারণা ৩: স্ত্রীর সব সম্পদ স্বামীর
হানাফি ফিকহে স্বামী ও স্ত্রীর পৃথক সম্পদের মালিকানা স্বীকৃত।
ভুল ধারণা ৪: স্বামীর প্রতিটি আদেশ মানা ফরজ
স্বামীর বৈধ অধিকার ও নির্দেশের প্রতি আনুগত্যের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু শরিয়তবিরোধী কাজে আনুগত্য করা যাবে না।
বাস্তব জীবনে কীভাবে এই দায়িত্বগুলো পালন করা যায়?
একটি সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে কাজে আসে:
মাসিক আয় ও ব্যয় নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরিষ্কার আলোচনা করা।
বড় আর্থিক সিদ্ধান্তে পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করা।
রাগের সময় অপমানজনক ভাষা ব্যবহার না করা।
স্বামী বা স্ত্রীর ব্যক্তিগত দুর্বলতা অন্যের কাছে প্রকাশ না করা।
সন্তান প্রতিপালনে সহযোগিতা করা।
শ্বশুর-শাশুড়ি ও উভয় পরিবারের প্রতি সম্মান বজায় রাখা।
সমস্যা বড় হওয়ার আগেই আলোচনা করা।
গুরুতর বিরোধে বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য নেওয়া।
নির্দিষ্ট ফিকহি সমস্যায় নিজের ধারণার ওপর নির্ভর না করে যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া।
সংক্ষিপ্ত সারাংশ
ইসলাম স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের অধিকার স্বীকার করেছে।
দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো ভালোবাসা, প্রশান্তি, রহমত ও পারস্পরিক দায়িত্ব।
স্ত্রীর ভরণপোষণ ও উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
স্বামীকে স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে।
স্ত্রীকে স্বামীর বৈধ অধিকার রক্ষা ও বৈধ বিষয়ে সহযোগিতা করতে হবে।
স্বামীর আনুগত্য শরিয়তবিরোধী কাজে প্রযোজ্য নয়।
স্ত্রীর নিজস্ব বৈধ সম্পদ তার নিজের মালিকানাধীন।
স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা করা উচিত।
দাম্পত্য বিরোধে কুরআন সালিশ ও মীমাংসার পথ দেখিয়েছে।
কোনো পক্ষের অধিকারই অন্য পক্ষের ওপর জুলুমের অনুমতি দেয় না।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
১. ইসলামে স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব কার?
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রয়োজনীয় নাফাকা, পোশাক ও বাসস্থানের দায়িত্ব মূলত স্বামীর ওপর। এর পরিমাণ পরিস্থিতি ও সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
২. স্ত্রী কি স্বামীর সব কথা মানতে বাধ্য?
না। স্বামীর বৈধ নির্দেশ ও অধিকারের ক্ষেত্রে স্ত্রীর আনুগত্যের দায়িত্ব রয়েছে; কিন্তু শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে আনুগত্য করা বৈধ নয়।
৩. স্ত্রীর নিজের উপার্জিত অর্থের মালিক কে?
স্ত্রীর বৈধভাবে অর্জিত বা তার মালিকানাধীন সম্পদ তার নিজের। শুধু বিবাহের কারণে তা স্বামীর সম্পদ হয়ে যায় না।
৪. স্ত্রী কি শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকতেই বাধ্য?
এ বিষয়ে সামাজিক রীতি ও ফিকহি বিধান এক বিষয় নয়। হানাফি ফিকহের আলোচনায় স্ত্রীর উপযুক্ত ব্যক্তিগত বাসস্থানের অধিকার রয়েছে। স্ত্রী নিজে সম্মত হলে যৌথভাবে বসবাসের বিষয়টি আলাদা।
৫. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হলে কী করা উচিত?
প্রথমে নিজেদের মধ্যে শান্তভাবে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। বিরোধ গুরুতর হলে কুরআন উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে সালিশ নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। — সূরা আন-নিসা, ৪:৩৫
৬. স্বামী কি স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে পারেন?
না। কুরআন স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ স্ত্রীদের প্রতি উত্তম আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন। — সূরা আন-নিসা, ৪:১৯; জামে তিরমিজি, ১১৬২
৭. স্বামী-স্ত্রীর অধিকার কি সম্পূর্ণ একই?
প্রত্যেকের কিছু পারস্পরিক অধিকার আছে, আবার কিছু দায়িত্ব স্বতন্ত্র। কুরআন ২:২২৮ পারস্পরিক অধিকারের মূলনীতি দিয়েছে; একই সঙ্গে পারিবারিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে স্বামীকে কিছু বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
৮. ব্যক্তিগত দাম্পত্য সমস্যায় কী করা উচিত?
সাধারণ নীতিগুলো কুরআন-হাদিস ও ফিকহ থেকে জানা যায়। তবে নির্যাতন, নাফাকা, নুশূয, তালাক, খোলা বা দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের মতো নির্দিষ্ট ঘটনায় ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
References
আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা, ২:২২৮।
আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা, ২:২৩৩।
আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা, ৪:১৯।
আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা, ৪:৩৪।
আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা, ৪:৩৫।
আল-কুরআন, সূরা আর-রূম, ৩০:২১।
আল-কুরআন, সূরা আত-তালাক, ৬৫:৬–৭।
সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৭১৩৮ — পরিবার সম্পর্কে দায়িত্বশীলতা।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩২৮a — রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আচরণ সম্পর্কে আয়িশা (রা.)-এর বর্ণনা।
জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ১১৬২ — স্ত্রীদের প্রতি উত্তম আচরণ।
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২১৪২ — স্ত্রীর অধিকার।
মুখতাসারুল কুদুরি, কিতাবুন নাফাকাত — হানাফি ফিকহে নাফাকা ও বাসস্থান।
রদ্দুল মুহতার — হানাফি ফিকহে নাফাকা ও সংশ্লিষ্ট বিধান।
আল-হিদায়া — স্বামী-স্ত্রীর পৃথক সম্পদের মালিকানা সংক্রান্ত ফিকহি আলোচনা।
