অনেকেই জানেন না কুরবানির এই মাসআলা!!

 



কুরআন, হাদীস ও ফিকহে হানাফির আলোকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

কুরবানী মুসলিম উম্মাহর একটি মহান ইবাদত। প্রতি বছর ঈদুল আযহা আসলেই মুসলমানদের ঘরে ঘরে কুরবানির প্রস্তুতি শুরু হয়। কেউ গরু কেনেন, কেউ ছাগল, আবার কেউ শরিকে অংশ নেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কুরবানির অনেক গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা না জানার কারণে অনেক সময় মানুষ ভুল করে বসেন। কেউ মনে করেন শুধু পশু জবাই করলেই দায়িত্ব শেষ, আবার কেউ মনে করেন কুরবানির কিছু নিয়ম না মানলেও সমস্যা নেই। অথচ ইসলামে কুরবানির রয়েছে নির্দিষ্ট বিধান, শর্ত ও আদব।

এই লেখায় আমরা কুরআন, সহীহ হাদীস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহে হানাফির কিতাবের আলোকে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা আলোচনা করবো, যা অনেকেই জানেন না।


কুরবানির মূল উদ্দেশ্য কী?

অনেকে মনে করেন কুরবানির মূল উদ্দেশ্য শুধু পশুর গোশত খাওয়া বা বিতরণ করা। অথচ কুরআন আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنْكُمْ

অর্থঃ “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭

অর্থাৎ কুরবানির মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাকওয়া এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা অর্জন করা।


কার উপর কুরবানি ওয়াজিব?

ফিকহে হানাফি অনুযায়ী, যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তার উপর কুরবানি ওয়াজিব।

ফাতাওয়া আলমগীরীতে এসেছে:

وَهِيَ وَاجِبَةٌ عَلَى كُلِّ حُرٍّ مُقِيمٍ مُوسِرٍ مِنْ أَهْلِ الْأَمْصَارِ

অর্থঃ “প্রত্যেক স্বাধীন, মুকীম ও সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব।”
الفتاوى الهندية ৫/২৯২

এখানে “মুসির” বলতে বোঝানো হয়েছে এমন ব্যক্তি, যার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে।


কুরবানির নিসাব কত?

অনেকেই মনে করেন শুধু যাকাতদাতার উপর কুরবানি ওয়াজিব। এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। যাকাত ও কুরবানির নিসাবের মাঝে পার্থক্য আছে।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার সমপরিমাণ সম্পদ থাকলেই কুরবানি ওয়াজিব হবে, যদিও সেই সম্পদ এক বছর পূর্ণ না হয়।

বাদায়েউস সানায়ে-এ এসেছে:

لَا يُشْتَرَطُ حَوَلَانُ الْحَوْلِ فِي وُجُوبِ الْأُضْحِيَّةِ

অর্থঃ “কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়।”
بدائع الصنائع ৫/৬৩


কুরবানির আগে নখ ও চুল কাটা যাবে কি?

এটি নিয়ে সমাজে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعْرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا

অর্থঃ “যখন জিলহজের দশ দিন শুরু হবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানির ইচ্ছা করবে, তখন সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৯৭৭

তবে হানাফি মাজহাবের ফকীহগণ এ নিষেধাজ্ঞাকে মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল বলেছেন, ওয়াজিব নয়।

রদ্দুল মুহতারে এসেছে:

وَالنَّهْيُ عَنْ أَخْذِ الشَّعْرِ وَالظُّفْرِ لِلتَّنْزِيهِ

অর্থঃ “চুল ও নখ কাটার নিষেধাজ্ঞা তানযীহী (অর্থাৎ উত্তম হলো বর্জন করা)।”
رد المحتار ৬/৩২৬

অতএব, না কাটাই উত্তম; তবে কাটলে কুরবানি সহীহ হবে।


শরিকে কুরবানির গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা

গরু বা উটে সাতজন পর্যন্ত শরিক হওয়া যায়। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেকে জানেন না।

যদি শরিকদের একজনের নিয়ত সহীহ না হয়, তাহলে সবার কুরবানি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

হিদায়ায় এসেছে:

إِذَا أَرَادَ أَحَدُ الشُّرَكَاءِ اللَّحْمَ فَقَطْ لَمْ يَجُزْ عَنْ الْبَاقِينَ

অর্থঃ “যদি শরিকদের কেউ শুধু গোশতের উদ্দেশ্যে অংশ নেয়, তাহলে অন্যদের পক্ষ থেকেও কুরবানি আদায় হবে না।”
الهداية ৪/৩৫৮

তাই শরিকে কুরবানির আগে সবার নিয়ত পরিষ্কার হওয়া জরুরি।


কুরবানির পশুর বয়স নিয়ে ভুল ধারণা

অনেকে দাঁত উঠলেই পশুকে কুরবানির উপযুক্ত মনে করেন। কিন্তু ইসলামে নির্ধারিত বয়স রয়েছে।

হাদীসে এসেছে:

لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً

অর্থঃ “তোমরা নির্ধারিত বয়সের পশু ছাড়া জবাই করো না।”
— সহীহ মুসলিম

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী:

  • উট: ৫ বছর
  • গরু: ২ বছর
  • ছাগল: ১ বছর
  • ভেড়া: ১ বছর (তবে মোটা-তাজা ৬ মাসের হলে কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি আছে)

যে ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়ে কুরবানি হবে না

এ মাসআলা অনেকে গুরুত্ব দেন না। অথচ ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়ে কুরবানি সহীহ হয় না।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا

অর্থঃ “স্পষ্ট কানা ও স্পষ্ট অসুস্থ পশু দ্বারা কুরবানি বৈধ নয়।”
— সুনানে তিরমিজি

ফিকহে হানাফিতে উল্লেখ আছে:

لَا تُجْزِئُ الْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا

অর্থঃ “যে খোঁড়া পশুর খোঁড়াভাব স্পষ্ট, তা দ্বারা কুরবানি জায়েজ নয়।”
الفتاوى الهندية ৫/২৯৭


কুরবানির সময়সীমা

অনেকে ঈদের নামাজের আগেই পশু জবাই করে ফেলেন, বিশেষ করে গ্রামে। এটি বড় ভুল।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصَّلَاةِ فَإِنَّمَا ذَبَحَ لِنَفْسِهِ

অর্থঃ “যে ঈদের নামাজের আগে জবাই করলো, সে নিজের জন্য গোশত জবাই করলো।”
— সহীহ বুখারী

অর্থাৎ কুরবানি সহীহ হবে না।


কুরবানির গোশত বণ্টনের নিয়ম

ইসলামে কুরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়স্বজন ও গরীবদের মধ্যে বিতরণ করা উত্তম।

কুরআনে এসেছে:

فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ

অর্থঃ “তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্তদের খাওয়াও।”
সূরা আল-হাজ্জ: ২৮

হানাফি ফিকহে তিন ভাগ করা মুস্তাহাব বলা হয়েছে:

১. নিজের পরিবার
২. আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু
৩. গরীব-মিসকিন


কুরবানির চামড়ার মাসআলা

অনেকে কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে চামড়া দিয়ে দেন। এটি জায়েজ নয়।

সহীহ হাদীসে এসেছে:

وَلَا يُعْطَى الْجَازِرُ مِنْهَا شَيْئًا

অর্থঃ “কসাইকে কুরবানির পশু থেকে কিছু দেওয়া যাবে না (পারিশ্রমিক হিসেবে)।”
— সহীহ বুখারী

ফাতাওয়া আলমগীরীতে এসেছে:

وَلَا يَبِيعُ جِلْدَهَا بِمَا يُنْتَفَعُ بِهِ

অর্থঃ “কুরবানির চামড়া এমনভাবে বিক্রি করা যাবে না, যাতে ব্যক্তি ব্যক্তিগত উপকার নেয়।”
الفتاوى الهندية ৫/৩০১

চামড়ার টাকা সদকা করতে হবে।


মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানি

অনেকেই মৃত বাবা-মায়ের নামে কুরবানি করেন। এটি জায়েজ।

হাদীসে এসেছে:

أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ ضَحَّى عَمَّنْ لَمْ يُضَحِّ مِنْ أُمَّتِهِ

অর্থঃ “নবী ﷺ তাঁর উম্মতের যেসব ব্যক্তি কুরবানি করতে পারেনি, তাদের পক্ষ থেকেও কুরবানি করেছেন।”
— মুসনাদ আহমদ

তবে জীবিত ব্যক্তির নিজের ওয়াজিব কুরবানি আগে আদায় করতে হবে।


অনলাইনে কুরবানি করা জায়েজ কি?

বর্তমানে অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা মাদরাসার মাধ্যমে অনলাইনে কুরবানি করেন। যদি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শরিয়ত অনুযায়ী পশু ক্রয় ও জবাই নিশ্চিত হয়, তাহলে এটি জায়েজ।

মূল বিষয় হলো:

  • পশু শরিয়তসম্মত হতে হবে
  • নির্ধারিত সময়ে জবাই হতে হবে
  • ওয়াকালত সঠিক হতে হবে

কুরবানির পশুর প্রতি আচরণ কেমন হবে?

ইসলাম পশুর প্রতিও দয়া শেখায়।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ

অর্থঃ “আল্লাহ সব কিছুর উপর সদাচরণ ফরজ করেছেন।”
— সহীহ মুসলিম

তাই পশুকে মারধর করা, এক পশুর সামনে আরেক পশু জবাই করা বা ছুরি ভোঁতা রাখা অনুচিত।


কুরবানি না দিলে কী হবে?

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি না করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَنْ وَجَدَ سَعَةً وَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا

অর্থঃ “যার সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।”
— সুনানে ইবনে মাজাহ

হানাফি ফিকহে এটি ওয়াজিব ইবাদত হিসেবে গণ্য।


কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা

আজকাল অনেকেই কুরবানিকে সামাজিক প্রতিযোগিতা বানিয়ে ফেলেছেন। কে বড় গরু কিনলো, কার গরুর দাম বেশি, এসব নিয়েই আলোচনা বেশি হয়। অথচ কুরবানির আসল শিক্ষা হলো ইখলাস, তাকওয়া ও আল্লাহর আনুগত্য।

হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কুরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। সেই ত্যাগের স্মৃতিই আজকের কুরবানি।


উপসংহার

কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাকওয়া ও আত্মত্যাগের এক অনন্য শিক্ষা। তাই কুরবানি করার আগে এর মাসআলা জানা অত্যন্ত জরুরি। কারণ অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় আমল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আমাদের উচিত কুরআন, সহীহ হাদীস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি কিতাব থেকে কুরবানির বিধান শেখা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহভাবে কুরবানি আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন