ডিজিটাল ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার
ফিকহে হানাফির আলোকে শরঈ বিশ্লেষণ
বর্তমান যুগে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে bKash Nagad এবং Rocket এই তিনটি সেবা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
তবে একজন সচেতন মুসলমানের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এসব ডিজিটাল ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না। এই লেখায় ফিকহে হানাফি অনুযায়ী কুরআন হাদিস ও নির্ভরযোগ্য হানাফি কিতাবের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
ডিজিটাল ও মোবাইল ব্যাংকিং কী
মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ব্যাংকিং বলতে এমন আর্থিক সেবা বোঝানো হয় যার মাধ্যমে টাকা সংরক্ষণ করা যায় টাকা পাঠানো ও গ্রহণ করা যায় বিল পরিশোধ করা যায় অনলাইন পেমেন্ট করা যায় এবং ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট করা যায়। এই সব কাজ মোবাইল বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে।
শরীয়তের সাধারণ নীতি লেনদেন মূলত হালাল
ইসলামী শরীয়তে অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো তা হালাল হবে যতক্ষণ না তাতে স্পষ্ট হারাম উপাদান পাওয়া যায়।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন
﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾
আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। (সূরা আল বাকারা আয়াত ২৭৫)
অতএব যে লেনদেনে রিবা তথা সুদ নেই তা মূলত বৈধ বলেই বিবেচিত হয়।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের চুক্তির শরঈ প্রকৃতি
ফিকহে হানাফি অনুযায়ী মোবাইল ব্যাংকিং মূলত তিনটি বৈধ চুক্তির সমন্বয়ে গঠিত।
এক ওয়াদিয়া অর্থাৎ আমানত
গ্রাহক যে টাকা তার অ্যাকাউন্টে রাখেন তা কোম্পানির কাছে আমানত হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। আল হিদায়া গ্রন্থে এসেছে আমানত গ্রহণ করা বৈধ এবং তার হেফাজতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়াও বৈধ (আল হিদায়া কিতাবুল ওয়াদিয়া)। এ কারণেই সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত।
দুই ওকালাত অর্থাৎ প্রতিনিধিত্ব
গ্রাহক মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে টাকা পাঠানো বিল পরিশোধ ইত্যাদি কাজের জন্য নিজের প্রতিনিধি বা ওকিল হিসেবে নিয়োগ করেন। বাদায়েউস সানায়ে গ্রন্থে বলা হয়েছে ওকালাত বিনিময়ের সাথেও বৈধ (বাদায়েউস সানায়ে ৬/২২)।
তিন ইজারা অর্থাৎ সেবা ভাড়া
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম অ্যাপ ও নেটওয়ার্ক ব্যবহারের বিনিময়ে যে চার্জ নেওয়া হয় তা ইজারা চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে বলা হয়েছে যে সেবার মাধ্যমে উপকার অর্জিত হয় তার উপর ভাড়া নেওয়া জায়েজ (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৪/৪৪৮)।
সার্ভিস চার্জ কি সুদের অন্তর্ভুক্ত
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে bKash বা Nagad এর চার্জ কি আসলে সুদ। এর ফিকহি উত্তর হলো না এটি সুদ নয়। কারণ জমাকৃত টাকার উপর কোনো অতিরিক্ত লাভ দেওয়া হয় না সময়ের কারণে টাকা বৃদ্ধি পায় না এবং চার্জ নেওয়া হয় সেবার বিনিময়ে।
রদ্দুল মুহতারে বলা হয়েছে ঋণের উপর শর্তযুক্ত বৃদ্ধি থাকলেই তা রিবা হিসেবে গণ্য হয় (ইবনে আবিদীন ৫/১৬১)।
হারাম কাজে ব্যবহারের দায় কার
কেউ যদি মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে জুয়া সুদী লেনদেন বা হারাম বেটিং করে তাহলে এর গুনাহ ব্যবহারকারীর উপরই বর্তায় সেবাটি নিজে হারাম হয়ে যায় না।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন
﴿وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴾
(সূরা আল মায়েদা আয়াত ২)
আল আশবাহ ওয়ান নাযায়ের গ্রন্থে বলা হয়েছে কোনো বস্তু নিজে হালাল হলে তার অপব্যবহারে বস্তুটি হারাম হয়ে যায় না।
ফিকহে হানাফির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
বৈধ বা জায়েজ হবে যদি সুদ গ্রহণ বা প্রদান না থাকে সার্ভিস চার্জ নির্ধারিত ও স্বচ্ছ হয় এবং হারাম কাজে ব্যবহার না করা হয়।
নাজায়েজ হবে যদি সুদভিত্তিক সেভিংস বা লোন যুক্ত থাকে অথবা সুদী বিনিয়োগে ব্যালেন্স ব্যবহার করা হয়।
উপসংহার
ফিকহে হানাফি অনুযায়ী বর্তমান সময়ে প্রচলিত bKash Nagad ও Rocket এর মাধ্যমে টাকা রাখা পাঠানো ও পেমেন্ট করা শর্তসাপেক্ষে বৈধ তথা জায়েজ। একজন মুসলমানের জন্য উত্তম হলো হালাল ব্যবহারে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা এবং সুদ ও হারাম লেনদেন থেকে দূরে থাকা।
