দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা ও রহমত: কুরআন-হাদিসের নির্দেশনা

 


বিবাহ ইসলামে শুধু একজন পুরুষ ও নারীর সামাজিক বন্ধন নয়; এটি শান্তি, দায়িত্ব, পারস্পরিক অধিকার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা থাকলে সংসারে স্বস্তি আসে। আর সেই ভালোবাসার সঙ্গে যখন দয়া, সহানুভূতি, ক্ষমা ও দায়িত্ববোধ যুক্ত হয়, তখন সম্পর্ক আরও সুন্দর হয়।

আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে তাঁর নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি মানুষের জন্য তাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। — সূরা আর-রূম, ৩০:২১।

এ আয়াত দাম্পত্য জীবনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—প্রশান্তি, ভালোবাসা এবং রহমত। তাই ইসলামে সুখী দাম্পত্য জীবন শুধু আবেগের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে উত্তম আচরণ, পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্ব পালন এবং কঠিন সময়েও একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা জড়িত।

কুরআনে দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি

প্রশান্তি ও নিরাপত্তার সম্পর্ক

আল্লাহ বলেন:

    “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”

         সূরা আর-রূম, ৩০:২১।

এখানে বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হিসেবে সাকিনা বা প্রশান্তি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ জীবনসঙ্গী এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে মানুষ নিজের জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে পারে এবং যার কাছে মানসিক স্বস্তি খুঁজে পায়।

ইবন কাসির তাঁর তাফসিরে মাওয়াদ্দাহকে ভালোবাসা এবং রহমাহকে দয়া বা মমতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা ও মমতার বিভিন্ন প্রকাশের কথাও উল্লেখ করেছেন।

মাওয়াদ্দাহ ও রহমত কী বোঝায়?

মাওয়াদ্দাহ বলতে ভালোবাসা, স্নেহ ও হৃদয়ের টান বোঝানো হয়। আর রহমাহ হলো দয়া, মমতা ও সহানুভূতি।

দাম্পত্য জীবনে এই দুইটির প্রয়োজন আলাদা হলেও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভালোবাসা মানুষকে কাছে টানে। আর রহমত মানুষকে এমন সময়ও সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীল থাকতে সাহায্য করে, যখন রাগ, অসুস্থতা, আর্থিক সংকট বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে সম্পর্ক কঠিন হয়ে ওঠে।

তাফসিরে মাওয়াদ্দাহ ও রহমতের ব্যাখ্যায় একাধিক বক্তব্য পাওয়া যায়। তাই কোনো একটি ব্যাখ্যাকেই একমাত্র অর্থ হিসেবে উপস্থাপন করার পরিবর্তে আয়াতের সামগ্রিক অর্থ—স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, মমতা ও পারস্পরিক সংযোগ—বোঝা অধিক উপযুক্ত।

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য আবরণ

আল্লাহ তাআলা বলে

                        “তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।”

      সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭।

পোশাক মানুষের শরীর ঢেকে রাখে, তাকে সুরক্ষা দেয় এবং তার ব্যক্তিগত সৌন্দর্য রক্ষা করে। এই আয়াতের দাম্পত্য প্রসঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গভীর দিক প্রকাশ পায়।

দাম্পত্য জীবনে একজনের উচিত অন্যজনের দুর্বলতা, ব্যক্তিগত বিষয় ও গোপনীয়তা রক্ষা করা। স্বামী বা স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা, অপমান করা বা তার দুর্বলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এই সম্পর্কের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

        “তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”

             সূরা আন-নিসা, ৪:১৯।

এখানে মা‘রূফ বা স্বীকৃত উত্তম পদ্ধতিতে বসবাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা শুধু মিষ্টি কথা বলা নয়; বরং সম্মানজনক আচরণ, দায়িত্ব পালন এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার মধ্যেও ভালোবাসা প্রকাশ পায়।

একই আয়াতে আল্লাহ এমন পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেছেন যখন কোনো কারণে স্বামীর স্ত্রীর কোনো বিষয় অপছন্দ হতে পারে। তখনও তাড়াহুড়ো করে সম্পর্ককে অস্বীকার না করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কারণ মানুষ কোনো একটি বিষয় অপছন্দ করলেও আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখতে পারেন।

এ শিক্ষা দাম্পত্য জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো মানুষই সব দিক থেকে নিখুঁত নয়।

রাসুল ﷺ-এর কাছে উত্তম মানুষ কে?

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

                    “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার স্ত্রীদের কাছে সর্বোত্তম।”

             জামে‘ আত-তিরমিজি, ৩৮৯৫। ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান গরিব সহিহ বলেছেন।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের উত্তম চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ তার নিজের ঘরের মানুষের সঙ্গে আচরণে।

বাইরের মানুষের সামনে ভদ্র হওয়া সহজ হতে পারে। কিন্তু ক্লান্তি, চাপ, মতবিরোধ ও ব্যক্তিগত সমস্যার মধ্যেও নিজের জীবনসঙ্গীর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা উত্তম চরিত্রের বাস্তব পরীক্ষা।

আরেক হাদিসে রাসুল ﷺ বলেছেন, ঈমানের দিক থেকে পরিপূর্ণ মুমিন সে, যার চরিত্র উত্তম; আর উত্তম ব্যক্তিরা তাদের নারীদের প্রতি উত্তম আচরণ করে। — জামে‘ আত-তিরমিজি, ১১৬২। ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন।

রাসুল ﷺ ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন

আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘরে কী করতেন। তিনি বলেন, তিনি পরিবারের কাজে নিয়োজিত থাকতেন; নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য বের হয়ে যেতেন।

         সহিহ আল-বুখারি, ৫৩৬৩।

সহিহ আল-বুখারির আরেক স্থানে একই বর্ণনা ৬০৩৯ নম্বরে এসেছে।

এটি দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা। পরিবারের কাজে সহযোগিতা করা ভালোবাসার একটি ব্যবহারিক প্রকাশ হতে পারে। সংসারের দায়িত্বের শরয়ি কাঠামো অবশ্যই আলাদা বিষয়; কিন্তু নিজের পরিবারের কাজে সহযোগিতা করা রাসুল ﷺ-এর জীবন থেকে প্রমাণিত একটি সুন্দর আচরণ।

ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়

অনেক সময় ভালোবাসাকে শুধু আবেগ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে দাম্পত্য ভালোবাসা আচরণেও প্রকাশ পেতে পারে।

যেমন:

  • সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা।

  • জীবনসঙ্গীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা।

  • তার ভালো কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

  • অসুস্থতা বা বিপদের সময় পাশে থাকা।

  • ভুল হলে ক্ষমা করার মানসিকতা রাখা।

  • পরিবারের কাজে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা।

  • ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখা।

  • রাগের সময় অপমানজনক কথা না বলা।

  • জীবনসঙ্গীর ভালো দিকগুলো মনে রাখা।

  • গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করা।

এসবের প্রতিটি বিষয় একই মাত্রায় ফরজ বা ওয়াজিব—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। কিছু বিষয় নৈতিক ও উত্তম আচরণের অন্তর্ভুক্ত, আবার কিছু বিষয় শরিয়ত নির্ধারিত অধিকার ও দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই দুটিকে আলাদা করে বোঝা জরুরি।

স্বামী-স্ত্রীর অধিকার পারস্পরিক

আল্লাহ বলেন:

     “আর নারীদের জন্যও ন্যায়সঙ্গতভাবে তেমন অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর পুরুষদের অধিকার রয়েছে।”

     সূরা আল-বাকারা, ২:২২৮।

আয়াতটি তালাক-সংক্রান্ত আলোচনার মধ্যে এসেছে। তাই এটিকে প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সব অধিকারকে হুবহু একই রকম বলা ঠিক হবে না। তবে আয়াতটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশ করে—দাম্পত্য সম্পর্কে নারীরও স্বীকৃত অধিকার রয়েছে এবং সম্পর্কটি একতরফা দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

ইসলামী ফিকহে স্বামী ও স্ত্রীর কিছু পৃথক অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। তাই দাম্পত্য ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে শরিয়ত নির্ধারিত দায়িত্বগুলো বাদ যাবে। বরং ভালোবাসা দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত হলে সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।

অপছন্দের মধ্যেও ন্যায় ও সংযম

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে সম্পূর্ণভাবে ঘৃণা না করে। তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য একটি স্বভাব পছন্দ হতে পারে।”

         সহিহ মুসলিম, ১৪৬৮b।

এই হাদিস দাম্পত্য জীবনের একটি বাস্তব সমস্যার দিকে দৃষ্টি দেয়। স্বামী বা স্ত্রী কারও সব অভ্যাস অন্যজনের পছন্দ হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

কোনো একটি দুর্বলতা বা অপছন্দের বিষয়কে কেন্দ্র করে পুরো মানুষটিকে মূল্যহীন মনে করা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই ভালো দিকগুলোও বিবেচনা করা এবং সমস্যাগুলোকে ন্যায়সঙ্গতভাবে মোকাবিলা করা ইসলামী চরিত্রের অংশ।

নারীদের সঙ্গে কোমল আচরণের নির্দেশ

রাসুল ﷺ নারীদের ব্যাপারে বিশেষভাবে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে তিনি নারীদের সঙ্গে ভালো আচরণের উপদেশ দিয়েছেন এবং তাদের স্বভাব ও অনুভূতির বিষয়ে কোমলতা অবলম্বনের শিক্ষা দিয়েছেন। — সহিহ মুসলিম, ১৪৬৮a।

এই হাদিসকে নারীদের অসম্পূর্ণ বা নিম্নতর প্রমাণ করার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং হাদিসের সরাসরি নির্দেশ হলো নারীদের সঙ্গে সদাচরণ করা। দাম্পত্য জীবনে মতপার্থক্য থাকলেও অপমান, কঠোরতা ও অন্যায় আচরণ থেকে বিরত থাকা জরুরি।

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হলে কী করা উচিত?

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ হওয়া মানেই সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে—এমন নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিরোধ কীভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে।

কুরআন গুরুতর দাম্পত্য বিরোধের ক্ষেত্রে উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে সালিশ নিয়োগের কথা বলেছে:

“যদি তোমরা উভয়ের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে একজন সালিশ তার পরিবার থেকে এবং একজন সালিশ তার পরিবার থেকে নিযুক্ত করো। তারা উভয়ে মীমাংসা চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিল সৃষ্টি করে দেবেন।”

         সূরা আন-নিসা, ৪:৩৫।

তাই সমস্যাকে দীর্ঘদিন জমিয়ে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী শান্তভাবে আলোচনা করা উচিত। সমস্যা গুরুতর হলে বিশ্বস্ত, বিচক্ষণ ও শরিয়তের জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।

তবে পারিবারিক সমস্যা সমাধানের নামে এমন ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী করা উচিত নয়, যিনি বিষয়টি আরও উত্তপ্ত করে তুলবেন বা এক পক্ষের ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেবেন।

রহমত মানে অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়

দাম্পত্য জীবনে রহমত ও ক্ষমার গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে একজন স্বামী বা স্ত্রী অন্যায়, নির্যাতন বা অধিকারহরণের সবকিছু নীরবে সহ্য করতেই থাকবে।

রহমতের অর্থ হলো ন্যায়, মমতা ও দায়িত্বের সঙ্গে আচরণ করা। গুরুতর সমস্যা হলে শরিয়তসম্মত উপায়ে সমাধান খোঁজা উচিত। পরিস্থিতি জটিল হলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলেম, মুফতি বা প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।

দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা বাড়ানোর কিছু বাস্তব উপায়

১. কথা বলার সময় সম্মান বজায় রাখা

রাগ হলেও এমন কথা বলা উচিত নয় যা পরে সম্পর্কের মধ্যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।

২. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা

জীবনসঙ্গী যে ছোট ছোট কাজগুলো করেন, সেগুলোকে স্বাভাবিক ধরে না নিয়ে ধন্যবাদ দেওয়া সম্পর্ককে উষ্ণ রাখে।

৩. ভুলের পাশাপাশি ভালো দিক দেখা

একটি ভুলের কারণে একজন মানুষের সব ভালো দিক ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে রাসুল ﷺ-এর নির্দেশ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

৪. সংসারের কাজে সহযোগিতা করা

রাসুল ﷺ নিজেই পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের কাজে সহযোগিতা করা সুন্দর সুন্নাহসম্মত আচরণের উদাহরণ হতে পারে।

৫. ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখা

স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় অপ্রয়োজনে বন্ধু, আত্মীয় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত নয়।

৬. মতবিরোধকে ব্যক্তিগত অপমানের পর্যায়ে না নেওয়া

সমস্যা নিয়ে কথা বলা এবং মানুষটিকে অপমান করা এক বিষয় নয়। মতবিরোধ থাকলেও ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করা উচিত।

প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

“ভালোবাসা থাকলেই দায়িত্বের প্রয়োজন নেই”

এটি সঠিক নয়। ইসলামে ভালোবাসার পাশাপাশি অধিকার, দায়িত্ব ও ন্যায়বিচারের বিষয়ও রয়েছে।

“মতবিরোধ হলেই দাম্পত্য সম্পর্ক ব্যর্থ”

এটিও ঠিক নয়। মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো তা কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে।

“রহমত মানে সবকিছু সহ্য করা”

রহমত অন্যায়কে বৈধ করে না। ন্যায় ও অধিকার রক্ষার বিষয়ও ইসলামের অংশ।

“শুধু স্বামীরই ভালো আচরণ করা দরকার”

কুরআন স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকারের কথা বলেছে। তবে স্বামী ও স্ত্রীর শরয়ি দায়িত্বের প্রকৃতি সব ক্ষেত্রে একই নয়। তাই “সব দায়িত্ব একেবারে সমান” অথবা “এক পক্ষের কোনো অধিকার নেই”—দুই ধরনের সরলীকরণই এড়িয়ে চলা উচিত।

সংক্ষিপ্ত সারাংশ

  • কুরআন দাম্পত্য জীবনে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও রহমতের কথা বলেছে।

  • সূরা আর-রূম ৩০:২১ দাম্পত্য সম্পর্কের অন্যতম প্রধান কুরআনিক ভিত্তি।

  • সূরা আন-নিসা ৪:১৯ স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে।

  • স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের “পোশাক” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭-এ।

  • রাসুল ﷺ নিজের পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

  • রাসুল ﷺ পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন।

  • দাম্পত্য ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়; সম্মান, দায়িত্ব, সহানুভূতি ও ক্ষমার মাধ্যমেও তা প্রকাশ পায়।

  • মতবিরোধ হলে অপমান বা প্রতিশোধের পরিবর্তে আলোচনা ও প্রয়োজন হলে সালিশের ব্যবস্থা করা উচিত।

  • রহমত মানে অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়; বরং ন্যায় ও মমতার সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করা।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

১. কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?

সূরা আর-রূম ৩০:২১-এ আল্লাহ বলেছেন, তিনি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও রহমত স্থাপন করেছেন এবং তাদের সম্পর্কের মধ্যে প্রশান্তি রেখেছেন।

২. মাওয়াদ্দাহ ও রহমাহ বলতে কী বোঝায়?

মাওয়াদ্দাহ সাধারণভাবে ভালোবাসা ও স্নেহের অর্থ প্রকাশ করে। রহমাহ বলতে দয়া, মমতা ও সহানুভূতি বোঝানো হয়। মুফাসসিরদের ব্যাখ্যায় শব্দ দুটির বিভিন্ন দিক পাওয়া যায়।

৩. স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে কেমন আচরণ করবে?

কুরআন স্ত্রীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপনের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুল ﷺ-ও নিজের পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণকে শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

৪. রাসুল ﷺ কি ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন?

হ্যাঁ। আয়িশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি পরিবারের কাজে নিয়োজিত থাকতেন এবং নামাজের সময় হলে নামাজে যেতেন। — সহিহ আল-বুখারি, ৫৩৬৩।

৫. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ হলে কী করা উচিত?

প্রথমে শান্তভাবে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। গুরুতর বিরোধ হলে সূরা আন-নিসা ৪:৩৫ অনুযায়ী উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে সালিশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৬. স্বামী তার স্ত্রীর কোনো বিষয় অপছন্দ করলে কী করবে?

রাসুল ﷺ বলেছেন, কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে সম্পূর্ণভাবে ঘৃণা না করে; তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য একটি স্বভাব পছন্দ হতে পারে। — সহিহ মুসলিম, ১৪৬৮b।

৭. দাম্পত্য জীবনে রহমত কি অন্যায় সহ্য করার নাম?

না। রহমত মানে দয়া, মমতা ও উত্তম আচরণ। অন্যায় বা গুরুতর অধিকারহরণের বিষয় হলে শরিয়তসম্মত উপায়ে সমাধান খোঁজা প্রয়োজন।

৮. দাম্পত্য সমস্যা গুরুতর হলে কার পরামর্শ নেওয়া উচিত?

বিষয়টি ফিকহি বা পারিবারিকভাবে জটিল হলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া ভালো। নির্যাতন বা নিরাপত্তার মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ও পেশাদার সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।

References

  1. আল-কুরআন, সূরা আর-রূম, ৩০:২১ — দাম্পত্য জীবনে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও রহমত।

  2. আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা, ৪:১৯ — স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ।

  3. আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭ — স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আবরণ হওয়ার উপমা।

  4. আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা, ২:২২৮ — নারীদের পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের নীতি।

  5. আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা, ৪:৩৫ — দাম্পত্য বিরোধে সালিশের নির্দেশ।

  6. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৩৬৩ — রাসুল ﷺ-এর পারিবারিক কাজে সহযোগিতার বর্ণনা।

  7. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬০৩৯ — একই বিষয়ে আয়িশা (রা.)-এর বর্ণনা।

  8. জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫ — পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণের মর্যাদা।

  9. জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস ১১৬২ — উত্তম চরিত্র ও নারীদের প্রতি উত্তম আচরণ।

  10. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৮a ও ১৪৬৮b — নারীদের সঙ্গে সদাচরণ এবং জীবনসঙ্গীর অপছন্দনীয় বিষয়ের পাশাপাশি তার ভালো দিক বিবেচনা করার শিক্ষা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন