কুরবানির গোশত বণ্টনের ইসলামিক নিয়ম

 


কুরআন হাদীস ও ফিকহে হানাফির আলোকে বিস্তারিত আলোচনা

কুরবানি ইসলামের একটি মহান ইবাদত। এটি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগের এক অনন্য শিক্ষা। প্রতি বছর ঈদুল আযহা আসলে মুসলমানরা আল্লাহর আদেশ পালন করার জন্য কুরবানি আদায় করেন। কিন্তু অনেকেই কুরবানির গোশত বণ্টনের সঠিক ইসলামিক নিয়ম জানেন না। কেউ পুরো গোশত নিজের কাছে রেখে দেন, আবার কেউ মনে করেন সব গোশত গরীবদের দিয়ে দিতে হবে। অথচ ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

কুরআন সুন্নাহ ও ফিকহে হানাফির নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে কুরবানির গোশত বণ্টনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরি।

কুরবানির গোশত বণ্টনের মূলনীতি

ইসলামে কুরবানির গোশত খাওয়া জায়েজ এবং অন্যদের খাওয়ানোও সওয়াবের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন

فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ

অর্থ
তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত গরীবদের খাওয়াও।

সূরা আল হাজ্জ ২৮

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন

فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ

অর্থ
তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবী ও প্রার্থীকে খাওয়াও।

সূরা আল হাজ্জ ৩৬

এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে কুরবানির গোশত শুধু নিজের জন্য নয়, বরং আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝেও বণ্টন করা গুরুত্বপূর্ণ আমল।

রাসূল ﷺ এর আমল

রাসূল ﷺ নিজেও কুরবানির গোশত খেতেন এবং সাহাবীদের মাঝে বিতরণ করতেন।

হাদীসে এসেছে

كُلُوا وَادَّخِرُوا وَتَصَدَّقُوا

অর্থ
তোমরা খাও, সঞ্চয় করো এবং সদকা করো।

সহীহ মুসলিম

এ হাদীস থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়

১ নিজেরা খাওয়া জায়েজ
২ ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা জায়েজ
৩ গরীবদের মাঝে বিতরণ করা উত্তম

গোশত তিন ভাগ করা কি জরুরি

আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে কুরবানির গোশত অবশ্যই তিন ভাগ করতে হবে। বাস্তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়, তবে মুস্তাহাব।

ফিকহে হানাফির কিতাবে এসেছে

يُسْتَحَبُّ أَنْ يَأْكُلَ الثُّلُثَ وَيُهْدِيَ الثُّلُثَ وَيَتَصَدَّقَ بِالثُّلُثِ

অর্থ
মুস্তাহাব হলো এক তৃতীয়াংশ নিজে খাবে, এক তৃতীয়াংশ হাদিয়া দিবে এবং এক তৃতীয়াংশ সদকা করবে।

بدائع الصنائع ٥ ٨١

অর্থাৎ তিন ভাগ করা উত্তম হলেও বাধ্যতামূলক নয়। কেউ চাইলে বেশি অংশ গরীবদের দিতে পারেন, আবার কেউ নিজের পরিবার বড় হলে বেশি অংশ নিজের জন্য রাখতে পারেন।

আত্মীয়স্বজনকে গোশত দেওয়া

কুরবানির গোশত আত্মীয়দের মাঝে বিতরণ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। বিশেষ করে গরীব আত্মীয়দের দিলে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়। কারণ এতে সদকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা দুটোই হয়।

রাসূল ﷺ বলেছেন

الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ وَهِيَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ

অর্থ
গরীবকে দান করলে একটি সওয়াব, আর আত্মীয়কে দান করলে দুটি সওয়াব পাওয়া যায়। একটি সদকার, আরেকটি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার।

সুনানে তিরমিজি

তাই কুরবানির গোশত বণ্টনের সময় আত্মীয়স্বজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো।

প্রতিবেশীকে গোশত দেওয়া

ইসলাম প্রতিবেশীর হক অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মুসলিম হোক বা অমুসলিম, উভয় প্রতিবেশীকেই কুরবানির গোশত দেওয়া জায়েজ।

হাদীসে এসেছে

مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ

অর্থ
জিবরীল আ আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিয়েছেন।

সহীহ বুখারী

তাই কুরবানির সময় পাশের বাড়ির মানুষের প্রতিও খেয়াল রাখা উচিত।

গরীবদের কতটুকু দেওয়া জরুরি

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী কুরবানির গোশতের কিছু অংশ সদকা করা ওয়াজিব নয়, তবে মুস্তাহাব। তবে সম্পূর্ণ গোশত নিজে রেখে দিলে কুরবানির সৌন্দর্য নষ্ট হয়।

ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় এসেছে

وَيَتَصَدَّقُ بِبَعْضِهَا

অর্থ
কুরবানির কিছু অংশ সদকা করবে।

الفتاوى الهندية ٥ ٣٠٠

অতএব, অন্তত কিছু অংশ গরীবদের দেওয়া উচিত।

সম্পূর্ণ গোশত নিজে খাওয়া যাবে কি

হ্যাঁ। দরিদ্র ব্যক্তি চাইলে পুরো গোশত নিজের পরিবারের জন্য রাখতে পারেন। এতে গুনাহ হবে না। কারণ ইসলাম মানুষের অবস্থা বিবেচনা করে সহজ বিধান দিয়েছে।

তবে সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য অন্যদের মাঝে বিতরণ করা উত্তম।

কুরবানির গোশত বিক্রি করা যাবে কি

কুরবানির গোশত বিক্রি করা জায়েজ নয়। এটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত ইবাদতের অংশ।

ফিকহে হানাফিতে এসেছে

لَا يَبِيعُ لَحْمَ الْأُضْحِيَّةِ

অর্থ
কুরবানির গোশত বিক্রি করা যাবে না।

الهداية ٤ ٣٥٩

যদি কেউ বিক্রি করে, তাহলে সেই টাকা সদকা করে দিতে হবে।

কসাইকে গোশত দিয়ে পারিশ্রমিক দেওয়া

অনেকে কসাইকে শ্রমের পারিশ্রমিক হিসেবে গোশত দেন। এটি শরিয়তসম্মত নয়।

হাদীসে এসেছে

وَلَا يُعْطَى الْجَازِرُ مِنْهَا شَيْئًا

অর্থ
কসাইকে কুরবানির পশু থেকে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছু দেওয়া যাবে না।

সহীহ বুখারী

তবে আলাদা হাদিয়া হিসেবে গোশত দেওয়া জায়েজ।

অমুসলিমকে গোশত দেওয়া যাবে কি

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী অমুসলিম প্রতিবেশী বা পরিচিত মানুষকে কুরবানির গোশত দেওয়া জায়েজ।

ফাতাওয়া আলমগীরীতে এসেছে

وَلَا بَأْسَ بِإِطْعَامِ الذِّمِّيِّ مِنْهَا

অর্থ
অমুসলিমকে কুরবানির গোশত খাওয়াতে সমস্যা নেই।

الفتاوى الهندية ٥ ٣٠٠

এটি ইসলামের সৌন্দর্য ও মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ।

মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানির গোশত

মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানি করলে তার গোশতও স্বাভাবিক নিয়মে বণ্টন করা যাবে। গরীবদের দেওয়া উত্তম, তবে নিজেও খেতে পারবেন।

মান্নতের কুরবানির গোশতের বিধান

মান্নতের কুরবানির গোশতের হুকুম আলাদা। মান্নতের কুরবানির গোশত কুরবানি দাতা নিজে খেতে পারবেন না।

ফিকহে হানাফিতে এসেছে

وَلَا يَأْكُلُ مِنَ الْمَنْذُورَةِ

অর্থ
মান্নতের কুরবানির গোশত থেকে নিজে খাবে না।

بدائع الصنائع ٥ ٨٤

এ গোশত পুরোপুরি গরীবদের মাঝে বণ্টন করতে হবে।

আকিকার গোশত ও কুরবানির গোশতের পার্থক্য

অনেকে আকিকা ও কুরবানির গোশতের বিধান এক মনে করেন। বাস্তবে কিছু পার্থক্য আছে। কুরবানির গোশত তিন ভাগ করা মুস্তাহাব হলেও আকিকার ক্ষেত্রে রান্না করে বিতরণ করা উত্তম বলা হয়েছে

ফ্রিজে সংরক্ষণ করা যাবে কি

হ্যাঁ। কুরবানির গোশত সংরক্ষণ করা জায়েজ। রাসূল ﷺ প্রথমে কিছু সময় নিষেধ করেছিলেন, পরে অনুমতি দিয়েছেন।

হাদীসে এসেছে

كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ لُحُومِ الْأَضَاحِيِّ فَوْقَ ثَلَاثٍ فَكُلُوا وَادَّخِرُوا

অর্থ
আমি তোমাদের তিন দিনের বেশি কুরবানির গোশত রাখতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা খাও এবং সংরক্ষণ করো।

সহীহ মুসলিম

বর্তমান যুগে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা সম্পূর্ণ জায়েজ।

শহর ও গ্রামের মানুষের মাঝে পার্থক্য

গ্রামে অনেক সময় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে। তাই সেখানে বেশি পরিমাণ সদকা করা উত্তম। শহরে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতদের মাঝে বিতরণ করা হয় বেশি। ইসলাম উভয় ক্ষেত্রেই নমনীয়তা রেখেছে।

গোশত বণ্টনে প্রদর্শনী করা অনুচিত

র্তমানে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি তুলে প্রচার করেন কে কত বড় গরু কুরবানি দিলেন বা কত মানুষের মাঝে গোশত বিতরণ করলেন। এতে ইখলাস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আল্লাহ তাআলা বলেন

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ

অর্থ
তাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে একনিষ্ঠভাবে।

সূরা আল বায়্যিনাহ ৫

তাই কুরবানির গোশত বণ্টনে আন্তরিকতা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা উচিত।

কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা

কুরবানির গোশত বণ্টনের মধ্যে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। ধনী গরীব সবাই একই আনন্দে অংশ নেয়। আত্মীয়তা বাড়ে, সমাজে ভালোবাসা সৃষ্টি হয় এবং দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটে।

হযরত ইবরাহীম আ এর ত্যাগের স্মৃতি শুধু পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস বিলিয়ে দেওয়ার শিক্ষাও এতে রয়েছে।

উপসংহার

কুরবানির গোশত বণ্টনের ইসলামিক নিয়ম অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক। ইসলাম মানুষকে শুধু নিজের কথা ভাবতে শেখায় না, বরং আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে শিক্ষা দেয়।

আমাদের উচিত কুরআন হাদীস ও ফিকহে হানাফির নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে মাসআলা জেনে সহীহভাবে কুরবানির আমল করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইখলাসের সাথে কুরবানি আদায় এবং সঠিকভাবে গোশত বণ্টনের তাওফীক দান করুন। আমীন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন