ইসলামে একজন মুসলমানের ঈমান ও ইসলামের মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কাউকে ‘কাফের’, ‘মুরতাদ’ বা ‘জাহান্নামি’ বলে দেওয়া সাধারণ কোনো কথা নয়। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি কোনো ভুল কথা বলেছে, গুনাহ করেছে বা এমন কোনো কাজ করেছে যা শরিয়তসম্মত নয়—এ কারণে তাকে সরাসরি ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে বলে ঘোষণা করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
ইসলামে তাকফির বলতে কোনো ব্যক্তিকে কাফের বলে সাব্যস্ত করাকে বোঝায়। কুরআন ও সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে। হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতেও মুসলমানের বক্তব্যের সম্ভাব্য ভালো ব্যাখ্যা থাকলে দ্রুত তাকফির না করার নীতি পাওয়া যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইসলামে কোনো কুফরি বিশ্বাস বা বক্তব্যকে কখনো কুফর বলা যাবে না। বরং কোনো কথা বা কাজের হুকুম এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর সেই হুকুম প্রয়োগ—দুটি বিষয় আলাদা। এই পার্থক্য বোঝা তাকফিরের আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাকফির কী?
‘তাকফির’ শব্দটি আরবি تكفير থেকে এসেছে। সাধারণ অর্থ হলো কাউকে কাফের সাব্যস্ত করা।
ফিকহ ও আকিদার আলোচনায় এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে:
কোনো বিশ্বাস, কথা বা কাজ শরিয়তের দৃষ্টিতে কুফরি কি না।
নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি সেই কুফরি কাজ বা কথা করার কারণে বাস্তবেই কাফের হয়ে গেছেন কি না।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর দলিলের ভিত্তিতে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ব্যক্তির বক্তব্যের অর্থ, উদ্দেশ্য, জ্ঞান, পরিস্থিতি, ভুল বোঝাবুঝি ও অন্যান্য শরয়ি বিষয় বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে। তাই সাধারণ মানুষ নিজের পক্ষ থেকে কাউকে কাফের ঘোষণা করার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকবে।
কুরআনে মুসলমানের ঈমান সম্পর্কে যাচাইয়ের নির্দেশ
সূরা আন-নিসা ৪:৯৪
আল্লাহ বলেন:
فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَىٰ إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا
অর্থের দিক থেকে আয়াতটিতে মুমিনদের সতর্ক করা হয়েছে—যাচাই না করে এমন ব্যক্তিকে ‘তুমি মুমিন নও’ বলা যাবে না, যে ইসলামের পরিচয় প্রকাশ করেছে।
আয়াতটির সরাসরি প্রেক্ষাপট ছিল যুদ্ধের পরিস্থিতি। তাই এটিকে তার প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করা ঠিক হবে না। তবে এতে যাচাই করার এবং বাহ্যিক ইসলামী পরিচয়কে অকারণে অস্বীকার না করার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি পাওয়া যায়।
ইবনু আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনায় এ আয়াতের অবতরণের একটি ঘটনা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে। সেখানে একজন ব্যক্তি সালাম দেওয়ার পরও তাকে হত্যা করার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১১
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ
অর্থাৎ পরস্পরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না। আয়াতের শুরুতে বিদ্রূপ ও অপমান থেকেও নিষেধ করা হয়েছে।
কাউকে ‘কাফের’, ‘ফাসিক’ বা অন্য কোনো অপমানজনক পরিচয়ে ডাকার ক্ষেত্রে এই আয়াতের নৈতিক শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১২
এ আয়াতে কুধারণা, গোপন অনুসন্ধান এবং গীবত থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
কোনো মানুষের একটি বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ছোট ভিডিও দেখে তার ঈমান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে এই নির্দেশনার সম্পর্ক রয়েছে। কোনো বিষয় অস্পষ্ট হলে আগে তথ্য ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা উচিত।
মুসলমানকে ‘কাফের’ বলা সম্পর্কে সহিহ হাদিস
সহিহ বুখারি ৬১০৩
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهِ أَحَدُهُمَا
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে ‘হে কাফের’ বললে তাদের একজনের ওপর সেই কথা ফিরে যায়।
এটি তাকফিরের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা।
সহিহ বুখারি ৬১০৪
ইবনু উমর (রা.) থেকে একই মর্মের আরেকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে:
أَيُّمَا رَجُلٍ قَالَ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا
সহিহ বুখারির ৬১০৪ নম্বর হাদিসে এটি উল্লেখিত হয়েছে।
সহিহ মুসলিম ৬০a ও ৬০b
সহিহ মুসলিমেও একই বিষয়ে ইবনু উমর (রা.)-এর বর্ণনা এসেছে। বিশেষ করে ৬০b-তে বলা হয়েছে—যাকে কাফের বলা হয়েছে সে যদি সত্যিই তেমন হয়, তাহলে কথা তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; আর যদি সে তেমন না হয়, তাহলে সেই অভিযোগকারীর দিকে ফিরে যায়।
এ কারণে রাগ, দলীয় বিরোধ, মতভেদ বা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কাউকে ‘কাফের’ বলা থেকে মুসলমানের বিরত থাকা উচিত।
সহিহ বুখারি ৬০৪৫-এর সতর্কতা
আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَرْمِي رَجُلٌ رَجُلًا بِالْفُسُوقِ، وَلَا يَرْمِيهِ بِالْكُفْرِ، إِلَّا ارْتَدَّتْ عَلَيْهِ
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি অন্য কাউকে ফাসিক বা কাফের বলে অভিযুক্ত করলে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি বাস্তবে তেমন না হয়, তাহলে সেই অভিযোগ তার নিজের দিকেই ফিরে আসে।
হাদিসটি দেখায় যে ‘কাফের’ শব্দকে সাধারণ গালি বা অপমানের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা ইসলামী আদবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
‘কুফরি কথা’ আর ‘ব্যক্তিকে কাফের বলা’ কি একই?
না, দুটি বিষয় এক নয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো বক্তব্য যদি কুরআন-সুন্নাহর অকাট্য কোনো মৌলিক বিশ্বাস অস্বীকার করে, আলেমরা সেই বক্তব্য বা বিশ্বাসকে কুফরি বলতে পারেন। কিন্তু সেই বক্তব্য উচ্চারণকারী নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর তাকফির প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে এই সতর্কতা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।
Hanafi Fiqh-এর আলোকে তাকফির
ইসলাম নিশ্চিত হওয়ার পর সন্দেহ দিয়ে তা দূর করা যায় না
ইবনু আবিদীন রহ. রদ্দুল মুহতার-এ ‘জামি‘উল ফুসূলাইন’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন যে, কোনো বিষয় নিশ্চিতভাবে রিদ্দাহ বা ইসলামত্যাগ হিসেবে প্রমাণিত হলে তার হুকুম দেওয়া হবে; কিন্তু কোনো বিষয় রিদ্দাহ কি না তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে তাকফির করা হবে না। একই আলোচনায় মুসলমানদের ব্যাপারে দ্রুত তাকফির না করার কথা বলা হয়েছে।
এখানে মূল নীতিটি হলো:
নিশ্চিত ইসলামকে শুধু সন্দেহের কারণে বাতিল করা যায় না।
ভালো ব্যাখ্যার সুযোগ থাকলে তাকফিরে সতর্কতা
রদ্দুল মুহতার-এ ইবনু আবিদীন রহ. উল্লেখ করেন:
لَا يُفْتَى بِكُفْرِ مُسْلِمٍ أَمْكَنَ حَمْلُ كَلَامِهِ عَلَى مَحْمَلٍ حَسَنٍ
অর্থাৎ কোনো মুসলমানের বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্য ভালো অর্থে নেওয়ার সুযোগ থাকলে তার কুফরের ফতোয়া দেওয়া হবে না। একই আলোচনায় বলা হয়েছে, কোনো বিষয়ে কুফরের একাধিক সম্ভাব্য দিক থাকলেও যদি একটি দিক তাকফির থেকে বিরত রাখে, তাহলে মুফতির সেই দিককে বিবেচনা করা উচিত।
এটি অবশ্যই এমন অর্থে নয় যে স্পষ্ট কুফরকে অস্বীকার করতে হবে। বরং অস্পষ্ট, দ্ব্যর্থক বা ব্যাখ্যার সুযোগ থাকা বক্তব্যে তাড়াহুড়া না করা—এটাই মূল শিক্ষা।
‘কুফর একটি গুরুতর বিষয়’
হানাফি ফিকহের উদ্ধৃত আলোচনায় এসেছে:
الْكُفْرُ شَيْءٌ عَظِيمٌ
অর্থাৎ কুফর অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। তাই কোনো মুসলমানকে কাফের সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া-তেও বলা হয়েছে, কোনো বিষয়ে কুফরের একাধিক সম্ভাবনা থাকলেও যদি এমন একটি ব্যাখ্যা থাকে যা তাকফির থেকে বিরত রাখে, তাহলে সেই ব্যাখ্যা বিবেচনা করা হবে; তবে কেউ যদি স্পষ্টভাবে কুফর বোঝানো অর্থই উদ্দেশ্য করে, তখন বিষয়টি ভিন্ন।
বড় গুনাহ করলেই কি মুসলমান কাফের হয়ে যায়?
না।
কোনো মুসলমান বড় গুনাহ করেছে—এটি এক বিষয়; আর সে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস অস্বীকার করেছে—এটি আরেক বিষয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ
“মুসলমানকে গালি দেওয়া ফুসুক এবং তার সঙ্গে যুদ্ধ করা কুফর।” —সহিহ বুখারি ৪৮; সহিহ মুসলিম ৬৪a।
এখানে হাদিসে ‘কুফর’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ বুঝতে শরিয়তের সামগ্রিক দলিল ও আলেমদের ব্যাখ্যা দেখতে হয়। শুধু কোনো গুনাহের ক্ষেত্রে ‘কুফর’ শব্দ এসেছে দেখেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে বলা সঠিক পদ্ধতি নয়।
তাই প্রতিটি গুনাহ = কুফর = ব্যক্তি কাফের—এমন সরল সমীকরণ ইসলামি জ্ঞানভিত্তিক আলোচনায় গ্রহণযোগ্য নয়।
কাউকে ‘জাহান্নামি’ বলা কি জায়েজ?
এখানেও সতর্কতা প্রয়োজন।
কুরআন ও সুন্নাহতে কিছু বিশ্বাস ও কাজের পরিণতি হিসেবে জাহান্নামের কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট মুসলমানকে নিজের পক্ষ থেকে নিশ্চিতভাবে ‘এই ব্যক্তি জাহান্নামি’ বলে দেওয়া আলাদা বিষয়।
আল্লাহ বলেন:
فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ ۖ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ
অর্থের দিক থেকে: “তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না; কে তাকওয়াবান, তিনি তা সবচেয়ে ভালো জানেন।” —সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩২।
আর সহিহ মুসলিম ২৬২৩-এ রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا قَالَ الرَّجُلُ هَلَكَ النَّاسُ فَهُوَ أَهْلَكُهُمْ
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যখন বলে, “মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে”, তখন সে নিজেই তাদের মধ্যে অধিক ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে পারে। হাদিসটির ব্যাখ্যায় অহংকার, অন্যদের তুচ্ছ করা এবং নিজেকে তাদের চেয়ে উত্তম মনে করার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
তাই সাধারণ মুসলমানের উচিত নিজের ব্যাপারে তওবা ও সংশোধনে মনোযোগ দেওয়া এবং অন্যের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে অহেতুক নিশ্চিত বক্তব্য না দেওয়া।
তবে যাদের ব্যাপারে কুরআন বা সহিহ সুন্নাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা জাহান্নামবাসী—সেসব নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দলিলের ভিত্তিতে তা বলা যায়। এখানে ব্যক্তিগত অনুমান ও শরিয়তের স্পষ্ট সংবাদকে এক করে দেখা যাবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকফিরের প্রবণতা কেন বিপজ্জনক?
অনলাইনে একটি ছোট ভিডিও, অসম্পূর্ণ বক্তব্য বা কয়েকটি উদ্ধৃতি দেখে মানুষের আকিদা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু একটি বক্তব্যের আগে-পরে কী বলা হয়েছে, বক্তা কী অর্থ বোঝাতে চেয়েছেন এবং বক্তব্যটি ভুল, অজ্ঞতাজনিত, উদ্ধৃত বা ব্যাখ্যামূলক কি না—এসব অনেক সময় জানা থাকে না।
তাই কোনো বক্তব্য সন্দেহজনক মনে হলে তিনটি বিষয় আলাদা করা উচিত:
প্রথমত: কথাটি সত্যিই কুফরি কি না।
দ্বিতীয়ত: বক্তা কী অর্থে কথাটি বলেছেন।
তৃতীয়ত: ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর তাকফিরের শরয়ি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না।
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর সাধারণত ফেসবুকের মন্তব্যের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় না।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
“কুফরি কথা বলেছে, তাই সঙ্গে সঙ্গে সে কাফের”
এটি অতিরিক্ত সরলীকরণ। বক্তব্যের হুকুম এবং ব্যক্তির ওপর হুকুম এক নয়।
“বড় গুনাহ করলে মানুষ কাফের হয়ে যায়”
এটি সঠিক নয়। বড় গুনাহ ও ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
“যে কাউকে কাফের বলা যায়, যদি তার কাজ আমার কাছে ভুল মনে হয়”
এমন ধারণার পক্ষে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো অবাধ তাকফিরের অনুমতি নেই। বরং সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা এসেছে।
“জাহান্নামি বলা শুধু একটি গালি”
এটিও হালকা বিষয় নয়। কারও চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করা শরিয়তের দৃষ্টিতে গুরুতর বক্তব্য। তাই এ ধরনের ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত।
বাস্তব জীবনে একজন মুসলমান কী করবেন?
কেউ এমন কথা বা কাজ করলে যা তার কাছে কুফরি মনে হচ্ছে, তখন:
সঙ্গে সঙ্গে তাকে কাফের বলা উচিত নয়।
বক্তব্য বা ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট যাচাই করতে হবে।
কথাটি কুফরি হওয়ার শরয়ি দলিল আছে কি না দেখতে হবে।
কোনো معتبر আলেম বা মুফতির কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা উচিত।
ব্যক্তি ভুল করলে তাকে সংশোধন ও নসিহত করার পথ গ্রহণ করা উচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনামূলক তাকফির থেকে বিরত থাকা উচিত।
ব্যক্তিগত রাগ, দলীয় বিরোধ বা রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ঈমান-কুফরের প্রশ্নে পরিণত করা উচিত নয়।
বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর তাকফিরের প্রশ্ন উঠলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
সংক্ষিপ্ত সারাংশ
তাকফির অর্থ কাউকে কাফের সাব্যস্ত করা।
কোনো কথা বা কাজ কুফরি হওয়া এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফের বলা একই বিষয় নয়।
কুরআন যাচাই ও সতর্কতার শিক্ষা দিয়েছে। —সূরা আন-নিসা ৪:৯৪।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে মুসলমানকে অন্যায়ভাবে ‘কাফের’ বলার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে।
হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে মুসলমানের বক্তব্যের ভালো ব্যাখ্যার সুযোগ থাকলে তাকফিরে তাড়াহুড়া না করার নীতি পাওয়া যায়।
বড় গুনাহ করলেই কাফের—এমন ভুল সাধারণীকরণ করা হয়নি।
কোনো নির্দিষ্ট মুসলমানকে নিজের পক্ষ থেকে নিশ্চিত ‘জাহান্নামি’ বলা থেকেও বিরত থাকা উচিত।
জটিল তাকফিরের বিষয় সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা উচিত।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
১. কোনো মুসলমানকে ‘কাফের’ বলা কি জায়েজ?
অন্যায়ভাবে কোনো মুসলমানকে কাফের বলা অত্যন্ত গুরুতর এবং সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।
২. কাউকে ভুলভাবে কাফের বললে কী হয়?
সহিহ মুসলিম ৬০b ও সহিহ বুখারি ৬০৪৫-এ বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বাস্তবে তেমন না হলে সেই অভিযোগের ভয়াবহতা অভিযোগকারীর ওপর ফিরে আসে।
৩. কোনো কথা কুফরি হলে বক্তা কি অবশ্যই কাফের?
এটি সরলভাবে বলা যায় না। বক্তব্যের হুকুম এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর তাকফির—দুটি আলাদা বিষয়। ব্যক্তির পরিস্থিতি ও শরয়ি বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়।
৪. বড় গুনাহ করলে কি মুসলমান কাফের হয়ে যায়?
শুধু বড় গুনাহ করার কারণে কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাফের বলা যায় না। কুফর ও গুনাহের ফিকহি পার্থক্য বুঝতে হবে।
৫. কাউকে ‘জাহান্নামি’ বলা কি জায়েজ?
সাধারণ কোনো মুসলমানের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নিজের পক্ষ থেকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়। তবে কুরআন বা সহিহ সুন্নাহ যাদের ব্যাপারে স্পষ্ট সংবাদ দিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সেই দলিল উদ্ধৃত করা আলাদা বিষয়।
৬. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে কাফের বলা যাবে?
কোনো পোস্ট, ভিডিও বা মন্তব্য দেখে তাড়াহুড়া করে তাকফির করা থেকে বিরত থাকা উচিত। বিষয়টি জটিল হলে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে যাচাই করা উচিত।
৭. কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্যে কুফরি কথা বললে কী করা উচিত?
প্রথমে বক্তব্যটি ঠিক কী ছিল এবং কোন অর্থে বলা হয়েছে তা যাচাই করতে হবে। এরপর প্রয়োজন হলে যোগ্য আলেম বা মুফতির কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করতে হবে। সাধারণ মানুষের উচিত নিজের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত তাকফিরের সিদ্ধান্ত না দেওয়া।
আরও জানুন:
References
আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা ৪:৯৪ — যাচাই এবং কাউকে ‘মুমিন নও’ বলার ব্যাপারে সতর্কতা।
আল-কুরআন, সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৬ — সংবাদ যাচাইয়ের নির্দেশ।
আল-কুরআন, সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১১–১২ — অপমানজনক উপাধি, কুধারণা ও গীবত থেকে নিষেধ।
আল-কুরআন, সূরা আন-নাজম ৫৩:৩২ — নিজেকে পবিত্র দাবি না করার নির্দেশ।
সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬১০৩ — মুসলমানকে ‘কাফের’ বলার ব্যাপারে সতর্কতা।
সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬১০৪ — একই বিষয়ে ইবনু উমর (রা.)-এর বর্ণনা।
সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬০৪৫ — ফুসুক বা কুফরের অপবাদ সম্পর্কে সতর্কতা।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬০a–৬০b — মুসলমানকে কাফের বলার ব্যাপারে সতর্কতা।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬৪a — মুসলমানকে গালি দেওয়া ফুসুক এবং তার সঙ্গে যুদ্ধকে কুফর বলা হয়েছে।
ইবনু আবিদীন, রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ, বাবুর রিদ্দাহ — মুসলমানকে তাকফিরের ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং বক্তব্যের ভালো ব্যাখ্যার নীতি।
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮৩ — কুফর ও তাকফিরের সম্ভাব্যতার ক্ষেত্রে সতর্কতার নীতি।
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬২৩ — ‘মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে’ ধরনের অহংকারপূর্ণ সাধারণীকরণ সম্পর্কে সতর্কতা।
