মৃত্যু একটি অবধারিত সত্য। পৃথিবীতে যত মানুষ জন্মেছে তাদের প্রত্যেককেই এই পথ পাড়ি দিতে হয়েছে এবং হবে। কিন্তু মৃত্যুর পরে কী ঘটে এই প্রশ্নটি মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়। ইসলামে এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং কুরআন ও হাদিসে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
মৃত্যু একটি নতুন যাত্রার শুরু
মৃত্যু আসলে শেষ নয় বরং এটি একটি নতুন জীবনের দরজা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
"প্রতিটি প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তোমাদের আমার কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে।" (সূরা আনকাবুত: ৫৭)
মানুষ যখন মারা যায় তখন তার রূহ দেহ থেকে বের হয়ে যায় এবং একটি মধ্যবর্তী জগতে প্রবেশ করে যাকে বলা হয় আলমে বারযাখ। এই বারযাখের জীবন কবর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
মৃত্যুর সময় কী ঘটে
মৃত্যুর সময় আযরাইল আলাইহিস সালাম রূহ কবজ করতে আসেন। নেককার বান্দার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ হয় আর পাপীর ক্ষেত্রে এটি কঠিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ الْعَبْدَ الْمُؤْمِنَ إِذَا كَانَ فِي انْقِطَاعٍ مِنَ الدُّنْيَا وَإِقْبَالٍ مِنَ الآخِرَةِ نَزَلَ إِلَيْهِ مَلائِكَةٌ مِنَ السَّمَاءِ بِيضُ الْوُجُوهِ
"যখন কোনো মুমিন বান্দা দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার এবং আখিরাতের দিকে যাওয়ার মুহূর্তে পৌঁছে তখন সাদা চেহারার ফেরেশতারা তার কাছে নেমে আসেন।" (সহিহ মুসলিম: ২৮৭২)
কবরের প্রথম রাত
কবরের প্রথম রাত মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাত। এই রাতে মুনকার ও নাকীর নামে দুজন ফেরেশতা আসেন এবং তিনটি প্রশ্ন করেন।
প্রথম প্রশ্ন: তোমার রব কে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: তোমার দ্বীন কী?
তৃতীয় প্রশ্ন: এই ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কী বলো?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিষয়ে বিস্তারিত বলেছেন:
إِنَّ الْعَبْدَ الْمُؤْمِنَ إِذَا أُقْعِدَ فِي قَبْرِهِ أَتَاهُ مَلَكَانِ فَسَأَلاهُ مَنْ رَبُّكَ وَمَا دِينُكَ وَمَنْ نَبِيُّكَ
"যখন কোনো মুমিন বান্দাকে তার কবরে বসানো হয় তখন দুজন ফেরেশতা তার কাছে আসেন এবং জিজ্ঞেস করেন তোমার রব কে তোমার দ্বীন কী এবং তোমার নবী কে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৫৩)
নেককার ব্যক্তির কবর
যে ব্যক্তি ঈমান ও আমলের সাথে জীবন কাটিয়েছে তার কবর হবে জান্নাতের একটি বাগান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
فَيُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ سَبْعُونَ ذِرَاعًا وَيُمْلأُ عَلَيْهِ خَضِرًا إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
"তার কবর সত্তর হাত পরিমাণ বিস্তৃত করা হবে এবং পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত সবুজ শ্যামল করে রাখা হবে।" (সুনানে তিরমিযি: ১০৭১)
পাপীর কবর
যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ অমান্য করে জীবন কাটিয়েছে তার কবর হবে অন্ধকার ও সংকীর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا
"যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জীবন হবে সংকীর্ণ।" (সূরা ত্বহা: ১২৪)
কবরের আযাব ও নিয়ামত
কবরে দুটি অবস্থাই রয়েছে আযাব এবং নিয়ামত। এই দুটো বিষয় কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার দুটো কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং বললেন:
إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لاَ يَسْتَتِرُ مِنَ الْبَوْلِ
"এই দুজনকে আযাব দেওয়া হচ্ছে এবং বড় কোনো বিষয়ের জন্য নয়। তাদের একজন প্রস্রাব থেকে সতর্ক থাকত না।" (সহিহ বুখারি: ২১৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় ছোট ছোট গুনাহও কবরের আযাবের কারণ হতে পারে।
কবরের আযাব থেকে বাঁচার আমল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি নামাজের শেষে এই দোয়া পড়তেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ
"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আযাব থেকে জাহান্নামের আযাব থেকে এবং জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।" (সহিহ বুখারি: ৮৩২)
সূরা মুলক নিয়মিত পাঠ করলে কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান
বারযাখের জীবন শেষ হবে শিঙায় ফুঁৎকার দেওয়ার মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الأَرْضِ إِلاَّ مَنْ شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ
"শিঙায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে তখন আল্লাহ যাকে চান তাকে ছাড়া আসমান ও যমিনের সকলে বেহুঁশ হয়ে যাবে। অতঃপর আবার ফুঁৎকার দেওয়া হবে তখন সকলে উঠে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকবে।" (সূরা যুমার: ৬৮)
পরিশেষে কথা
মৃত্যুকে ভয় নয় বরং মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়াই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ
"তোমরা সুখের ছেদকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।" (সুনানে তিরমিযি: ২৩০৭)
কবরের প্রথম রাতের কথা মনে রাখলে মানুষের জীবন আপনাআপনি পরিশুদ্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের কবরকে নূরময় করুন এবং কবরের আযাব থেকে হেফাজত করুন।
