ঈদুল আযহায় করণীয় ও বর্জনীয়


কুরআন, হাদীস ও ফিকহে হানাফির আলোকে একটি বিস্তারিত আলোচনা

ঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এটি শুধু আনন্দের দিন নয়; বরং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ, তাকওয়া, ত্যাগ ও আনুগত্যের মহান শিক্ষা বহন করে। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ঐতিহাসিক কুরবানির ঘটনাকে স্মরণ করে মুসলমানরা প্রতি বছর এই ইবাদত পালন করে থাকে।

বর্তমান সময়ে অনেক মুসলমান ঈদুল আযহার বাহ্যিক আয়োজন সম্পর্কে জানলেও করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। ফলে অনেক সময় সুন্নাহ পরিপন্থী কাজ, অপচয় কিংবা ভুল মাসআলা চর্চা হয়ে যায়। তাই কুরআন, সহীহ হাদীস ও ফিকহে হানাফির আলোকে ঈদুল আযহায় আমাদের কী করা উচিত এবং কী থেকে বিরত থাকা উচিত তা জানা জরুরি।

ঈদুল আযহার মূল শিক্ষা

ঈদুল আযহার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ

অর্থঃ “আল্লাহর নিকট পৌঁছে না কুরবানির গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
 সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭

এই আয়াত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়, কুরবানির মূল উদ্দেশ্য পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহভীতি ও আনুগত্য প্রকাশ করা।

ঈদুল আযহায় করণীয়

১. তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা

যিলহজের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব।

তাকবীরটি হলো:

اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ

ফিকহে হানাফিতে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য এটি পড়া ওয়াজিব।

২. ঈদের নামাজ আদায় করা

ঈদুল আযহার নামাজ ওয়াজিব। এটি জামাতের সাথে আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পদ্ধতি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত ঈদের সালাত আদায় করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন।

হাদীসে এসেছে:

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَخْرُجُ يَوْمَ الْفِطْرِ وَالْأَضْحَى إِلَى الْمُصَلَّى

অর্থঃ “রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহে যেতেন।”
 সহীহ বুখারী, হাদীস: ৯৫৬

৩. কুরবানি করা

যাদের ওপর কুরবানি ওয়াজিব, তাদের জন্য কুরবানি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

ফিকহে হানাফি অনুযায়ী, যে মুসলমান নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক এবং মুকীম, তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

অর্থঃ “তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কুরবানি কর।”
 সূরা আল-কাওসার: ২

হানাফি ফকীহগণ এই আয়াত থেকে কুরবানির ওয়াজিব হওয়া প্রমাণ করেছেন।

৪. কুরবানির আগে নখ ও চুল না কাটা

যে ব্যক্তি কুরবানি করার নিয়ত রাখে, তার জন্য যিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানি করা পর্যন্ত নখ ও চুল না কাটা মুস্তাহাব।

হাদীসে এসেছে:

إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعْرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا

অর্থঃ “যখন যিলহজের দশদিন শুরু হয় এবং তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছা করে, তখন সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে।”
 সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৯৭৭

ফিকহে হানাফিতে এটি মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য।

৫. উত্তম পশু নির্বাচন করা

কুরবানির পশু সুস্থ, ত্রুটিমুক্ত ও হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উচিত। অসুস্থ, অন্ধ, খোঁড়া বা অত্যধিক দুর্বল পশু দ্বারা কুরবানি সহীহ হয় না।

হাদীসে এসেছে:

أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِيِّ

অর্থঃ “চার ধরনের পশু কুরবানিতে জায়েজ নয়…”
 সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৮০২

৬. কুরবানির গোশত বণ্টন করা

কুরবানির গোশত নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও গরীবদের মধ্যে বণ্টন করা উত্তম। সাধারণভাবে তিন ভাগে ভাগ করার কথা উল্লেখ করা হয়:

১. নিজের পরিবারের জন্য
২. আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের জন্য
৩. গরীব-মিসকীনদের জন্য

এতে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায় এবং গরীবরাও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে।

৭. বেশি বেশি তাকবীর, তিলাওয়াত ও ইবাদত করা

ঈদুল আযহার দিনগুলো অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ। বিশেষ করে যিলহজের প্রথম দশদিন সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ

অর্থঃ “এই দিনগুলোতে নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আর কোনো দিন নেই।”
 সহীহ বুখারী, হাদীস: ৯৬৯

তাই এসব দিনে নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দোয়া বৃদ্ধি করা উচিত।

ঈদুল আযহায় বর্জনীয় বিষয়সমূহ

১. রিয়া ও লোক দেখানো

অনেকে কুরবানিকে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলে। বড় পশু কেনা, ভিডিও করা, অতিরিক্ত প্রচার করা ইত্যাদি কাজ নিয়তকে নষ্ট করতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ

অর্থঃ “তাদেরকে শুধু এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।”
 সূরা আল-বাইয়্যিনাহ: ৫

২. পশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ

কুরবানির পশুকে মারধর করা, ক্ষুধার্ত রাখা বা অন্য পশুর সামনে জবাই করা নিষেধ।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ

অর্থঃ “নিশ্চয় আল্লাহ সব কাজেই উত্তম আচরণ আবশ্যক করেছেন।”
 সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৯৫৫

৩. কুরবানির পশুর ছবি ও ভিডিও নিয়ে অহংকার করা

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পশুর ছবি প্রদর্শন, দাম প্রকাশ, অহংকারমূলক পোস্ট দেওয়া সাধারণ প্রবণতা হয়ে গেছে। এটি নিয়তের বিশুদ্ধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ইবাদতের মূল হলো ইখলাস। মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করলে তার সওয়াব নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৪. অপচয় ও বিলাসিতা

ঈদ উপলক্ষে অপ্রয়োজনীয় খরচ, খাবারের অপচয়, অতিরিক্ত সাজসজ্জা ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় ইসলাম সমর্থন করে না।

আল্লাহ বলেন:

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ

অর্থঃ “অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।”
 সূরা আল-ইসরা: ২৭

৫. কুরবানির গোশত বিক্রি করা

কুরবানির গোশত, চামড়া বা কোনো অংশ বিক্রি করে ব্যক্তিগতভাবে টাকা ভোগ করা জায়েজ নয়।

ফিকহে হানাফির কিতাবে এসেছে:

وَلَا يَبِيعُ مِنْهَا شَيْئًا

অর্থঃ “কুরবানির কোনো অংশ বিক্রি করবে না।”
 আল-হিদায়াহ, কিতাবুল উযহিয়্যাহ

তবে চামড়া দান করা বা বিক্রি করে তার মূল্য সদকা করা জায়েজ।

৬. কসাইকে গোশত দিয়ে পারিশ্রমিক দেওয়া

কসাইয়ের মজুরি আলাদা টাকা দিয়ে পরিশোধ করতে হবে। কুরবানির গোশত, চামড়া বা মাথা পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়।

হাদীসে এসেছে:

وَلَا تُعْطِ الْجَازِرَ مِنْهَا شَيْئًا

অর্থঃ “কসাইকে কুরবানির কোনো অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে দিও না।”
 সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩১৭

৭. নামাজ ছেড়ে শুধু কুরবানিতে ব্যস্ত থাকা

অনেকে কুরবানির ব্যস্ততায় ফরজ নামাজ অবহেলা করে। অথচ নামাজ ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত।

কুরবানি একটি ওয়াজিব আমল হলেও নামাজের বিকল্প নয়।

৮. পরিবেশ নোংরা করা

রাস্তা, ড্রেন বা জনসমাগমস্থলে পশুর বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণ করা ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী।

ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে শিক্ষা দিয়েছে।

হাদীসে এসেছে:

الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ

অর্থঃ “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।”
 সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৩

৯. শরিকানার মাসআলায় অবহেলা

গরু বা উটে শরিক হওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের নিয়ত সহীহ হওয়া জরুরি। কোনো শরিক যদি শুধুমাত্র গোশতের উদ্দেশ্যে শরিক হয়, তাহলে অনেক ফকীহের মতে সবার কুরবানি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই শরিক নির্বাচনেও সতর্ক থাকা উচিত।

ফিকহে হানাফির গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাসআলা

কুরবানির সময়

১০ যিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ যিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করা জায়েজ।

ঈদের নামাজের আগে কুরবানি করলে তা সহীহ হবে না।

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি

মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানি করা জায়েজ এবং সওয়াব পৌঁছে। তবে জীবিত ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব কুরবানি আগে আদায় করতে হবে।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কুরবানি

যদি ঋণ পরিশোধের পর নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে কুরবানি ওয়াজিব হবে।

নারীর ওপর কুরবানি

যে নারীর কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তার ওপরও কুরবানি ওয়াজিব।

ঈদুল আযহার সামাজিক শিক্ষা

ঈদুল আযহা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি সামাজিক ভ্রাতৃত্বেরও শিক্ষা দেয়। কুরবানির গোশত দরিদ্রদের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা সৃষ্টি হয়। ধনী-গরীব সবাই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে।

একইসাথে এই ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দেওয়াই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়।

উপসংহার

ঈদুল আযহা মুসলিম জীবনের এক মহান ইবাদতপূর্ণ উপলক্ষ। এই ঈদ কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আত্মত্যাগ, তাকওয়া, ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের প্রতীক। তাই ঈদুল আযহায় আমাদের উচিত সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা, অপচয় ও লোক দেখানো থেকে বেঁচে থাকা এবং কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহ আকীদা ও সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদুল আযহা পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

তথ্যসূত্র

১. আল-কুরআনুল কারীম
২. সহীহ বুখারী
৩. সহীহ মুসলিম
৪. সুনানে আবু দাউদ
৫. আল-হিদায়াহ
৬. বাদায়েউস সানায়ে
৭. ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন