ফিকহে হানাফির নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে একটি সহজ ও প্রামাণ্য আলোচনা
ঈদুল আযহা সামনে আসলেই কুরবানি সম্পর্কিত নানা মাসআলা নিয়ে মানুষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, “একটি পশুতে কি আকিকা ও কুরবানির নিয়ত একসাথে করা যাবে?” বিশেষ করে যাঁরা গরুতে শরিক হয়ে কুরবানি করেন, তাঁদের অনেকেই সন্তানের আকিকার বিষয়টিও একই সাথে আদায় করতে চান।
এই প্রশ্ন নতুন নয়। ফুকাহায়ে কেরাম বহু আগেই এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং ফিকহে হানাফির নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলোতে এর স্পষ্ট সমাধান উল্লেখ রয়েছে। এখানে সেই আলোচনাগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
কুরবানি ও আকিকা: দুটি ভিন্ন ইবাদত
কুরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্ধারিত দিনে পশু জবাই করা। এটি হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের মহান ত্যাগের স্মরণে আদায় করা হয়।
অন্যদিকে আকিকা হলো সন্তানের জন্মের পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের একটি সুন্নত আমল। সাধারণত সন্তানের জন্মের সপ্তম দিনে এটি করা উত্তম।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
كُلُّ غُلَامٍ مُرْتَهَنٌ بِعَقِيقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ
“প্রত্যেক শিশু তার আকিকার বিনিময়ে আবদ্ধ থাকে। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে পশু জবাই করা হবে।”
— সুনানে তিরমিযী, হাদিস: ১৫২২
দুটি ইবাদতের উদ্দেশ্য আলাদা হলেও, অনেক সময় বাস্তবতার কারণে মানুষ এক পশুতে উভয়ের নিয়ত করার ব্যাপারে জানতে চান।
হানাফি মাযহাব কী বলে?
ফিকহে হানাফির গ্রহণযোগ্য কিতাবসমূহ অনুযায়ী, গরু বা উটের মতো বড় পশুতে আলাদা অংশের মাধ্যমে আকিকা ও কুরবানির নিয়ত একত্রে করা জায়েয।
অর্থাৎ, সাত শরিকের একটি গরুতে:
- কেউ কুরবানির নিয়ত করতে পারবেন,
- কেউ আকিকার নিয়ত করতে পারবেন,
- আবার কেউ নফল কুরবানির নিয়তও করতে পারবেন।
এতে শরিকানা সহীহ হবে।
বাদায়েউস সানায়ে-এর বক্তব্য
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব বাদায়েউস সানায়ে-এ ইমাম কাসানী রহ. লিখেছেন:
وَلَوِ اشْتَرَكَ سَبْعَةٌ فِي بَدَنَةٍ أَوْ بَقَرَةٍ وَاخْتَلَفَتْ جِهَاتُهُمْ، بِأَنْ أَرَادَ بَعْضُهُمُ الْقُرْبَةَ وَبَعْضُهُمُ الْمَتَاعَ جَازَ
অর্থাৎ,
“সাতজন ব্যক্তি যদি একটি গরু বা উটে শরিক হয় এবং তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়, তাহলে তা জায়েয হবে।”
— বাদায়েউস সানায়ে, ৫/৭১
এখানে ফুকাহায়ে কেরাম বুঝিয়েছেন, বড় পশুর প্রতিটি অংশ স্বতন্ত্র কুরবতের মর্যাদা রাখে। তাই একেকজন একেক ধরনের ইবাদতের নিয়ত করতে পারেন।
রদ্দুল মুহতারে স্পষ্ট বক্তব্য
আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী রহ. আরো স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
لَوْ أَرَادَ بَعْضُهُمْ الْعَقِيقَةَ وَبَعْضُهُمُ الْأُضْحِيَّةَ جَازَ
অর্থ:
“কিছু শরিক যদি আকিকার নিয়ত করে এবং কিছু শরিক কুরবানির নিয়ত করে, তাহলে তা জায়েয হবে।”
— রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৬
এই বক্তব্য হানাফি মাযহাবের এ মাসআলায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গণ্য হয়।
ফাতাওয়া হিন্দিয়ার উদ্ধৃতি
ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তেও একই মাসআলা উল্লেখ করা হয়েছে:
وَإِنِ اشْتَرَكَ جَمَاعَةٌ فِي بَقَرَةٍ وَأَرَادَ بَعْضُهُمُ الْعَقِيقَةَ وَبَعْضُهُمُ الْأُضْحِيَّةَ أَجْزَأَهُمْ
অর্থ:
“কয়েকজন ব্যক্তি যদি একটি গরুতে শরিক হয় এবং কেউ আকিকার নিয়ত করে, কেউ কুরবানির নিয়ত করে, তাহলে তা তাদের জন্য যথেষ্ট হবে।”
— ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩০৪
একটি অংশে কি একসাথে আকিকা ও কুরবানির নিয়ত করা যাবে?
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, যা অনেকে খেয়াল করেন না।
গরুর আলাদা আলাদা অংশে ভিন্ন নিয়ত করা জায়েয। কিন্তু একই অংশকে একসাথে “আকিকা” ও “কুরবানি” উভয়ের জন্য নির্ধারণ করা নিয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু মতভেদ আছে।
অনেক ফকিহের মতে, প্রতিটি ইবাদত আলাদা নিয়ত ও উদ্দেশ্যের হওয়ায় পৃথক রাখাই উত্তম। তাই সামর্থ্য থাকলে:
- কুরবানি আলাদা,
- আকিকা আলাদা
করাই ভালো।
তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যদি কেউ বড় পশুতে আলাদা অংশের মাধ্যমে উভয় ইবাদত আদায় করেন, তাহলে তা সহীহ হবে ইনশাআল্লাহ।
বাস্তব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
বর্তমান সময়ে অনেক পরিবারের জন্য আলাদা পশু দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। বিশেষত যাদের সদ্য সন্তান হয়েছে এবং একই সাথে ঈদুল আযহাও চলে এসেছে, তাদের জন্য এই মাসআলাটি অনেক সহজতা সৃষ্টি করে।
ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, শরিয়ত মানুষের কষ্ট নয়; বরং সামর্থ্য ও বাস্তবতার দিকটিও বিবেচনা করে।
সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত
ফিকহে হানাফির নির্ভরযোগ্য কিতাব অনুযায়ী:
- গরু বা উটের আলাদা অংশে আকিকা ও কুরবানির নিয়ত করা জায়েয।
- শরিকদের নিয়ত ভিন্ন হতে পারে।
- সব নিয়তই ইবাদতের উদ্দেশ্যে হতে হবে।
- সামর্থ্য থাকলে পৃথক পশু দেওয়া উত্তম।
- তথ্যসূত্র
- বাদায়েউস সানায়ে — ইমাম কাসানী রহ.
- রদ্দুল মুহতার — ইবনে আবিদীন শামী রহ.
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া
- সুনানে তিরমিযী, হাদিস: ১৫২২
- সূরা কাউসার: ২
