চেয়ারে বসে নামায পড়ার বিধান
মানুষের জীবন-মরণ সুস্থতা-অসুস্থতা সবকিছুই মহান আল্লাহ তা‘আলার কুদরতী হাতে।
তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত হলো, জীবন চলার পথে সে যখন যে অবস্থার সম্মুখীন হবে,
সর্বাবস্থায় সে তাঁরই বিধান জানবে এবং তদনুযায়ী আমল করতে সচেষ্ট হবে। কেননা,
শরী‘আত শারীরিক অবস্থার সাথে সঙ্গতি বজায় রেখে অসুস্থতা ও অপারগতার সময় তার
উপর অর্পিত বিধান কখনো শিথিল করেছে, কখনো অবস্থার ভিত্তিতে তার সাধ্যের উপর
ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অনেকে শরী‘আতের সঠিক বিধান না জানার কারণে কখনো শিথিলতা গ্রহণে সীমালঙ্ঘন করে থাকে। এমনকি অনেকে বলে বসে যে, “ওযরের কোনো মাসআলা নেই” বরং মা’যুর ব্যক্তি শর‘য়ী হুকুমের আওতামুক্ত। আবার কখনো সহজ বিধানকে কঠিন করে ফেলে, ফলে শরী‘আতের বিভিন্ন বিধান হয়ে ওঠে প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ, ইসলামী শরী‘আহ্ একটি পরিপূর্ণ ও সার্বজনীন জীবন বিধান। এতে নেই কোনো কঠোরতা,নেই কোনো শিথিলতা। তাই শরী‘আত অসুস্থ ব্যক্তির নামাযের বিষয়ে কতটুকু রুখসাত বা ছাড় দিয়েছে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অতীব জরুরী।
চেয়ারে বসে নামাযের বিধান
এক সময় তো এমন ছিলো যে, মসজিদে চেয়ার আনা এবং তাতে বসে নামায পড়ার
কল্পনাও করা যেত না। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে মসজিদে চেয়ারে বসে নামায আদায়কারীর সংখ্যা এমন বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেখে সত্যি হতবাক হতে হয়। তাদের মধ্যে অনেকে তো শরী‘আতসম্মত ওযরের কারণেই চেয়ারে বসে নামায আদায় করে। আবার কেউ শরী‘আতসম্মত ওযর ছাড়া নিছক আরামের জন্য এরূপ করে থাকেন। এমনকি কতিপয় মুসল্লি রুকু-সিজদার মাধ্যমে মাটিতে বসে নামায আদায়ে সক্ষম, এতদসত্তে¡ও তারা নির্দ্বিধায় চেয়ারে বসে নামায আদায় করে চলেছেন। আর এসব অবস্থা মূলত চেয়ারে বসে নামায পড়ার বিধান না জানার কারণেই হচ্ছে। তাই উক্ত বিষয়ের শর‘য়ী সমাধান নিম্নে আলোচনা করা হলো।
যে ব্যক্তি কিয়াম, রুকু-সিজদা কোনোটাই করতে সক্ষম নয়, সে যদি জমিনে বসে নামায
পড়তে সক্ষম হয়, তাহলে তার জন্য যেভাবে বসতে সহজ হয় সেভাবেই জমিনে বসে
ইশারায় নামায আদায় করবে (তবে তাশাহহুদের বৈঠকের ন্যায় বসা ভালো)। এধরনের
ব্যক্তির জন্য চেয়ারে বসে নামায পড়া জায়েয আছে তবে অনুত্তম। আর রুকু-সিজদা করতে সক্ষম ব্যক্তি যদি এমনটি করে তাহলে তার নামাযই হবে না।
তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি জমিনে বসে থাকতে সক্ষম নয়, অথবা তার জমিনে বসে নামায পড়তে খুব কষ্ট হয়। এমন ব্যক্তিও যদি জমিনে বসে কোনো কিছুর সাথে হেলান দিয়ে নামায পড়তে
সক্ষম হয় তাহলে তার জন্য সেভাবেই নামায পড়া উত্তম। তবে চেয়ারে বসে নামায পড়ার
সুযোগ আছে। কিন্তু ইশারায় নামায আদায় করার জন্যও যথাসম্ভব চেয়ার ব্যবহার না করা
উচিত। কেননা, জমিনে বসে নামায আদায় করাই উত্তম ও মাসনূন তরীকা। এর উপরই
সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এবং পরবর্তী ফকীহগণের আমল চলে আসছে। খাইরুল কুরূনে
চেয়ারে নামায পড়ার কোনো নযীর পাওয়া যায় না। অথচ, সে যুগে মা‘যূরও ছিল, চেয়ারও
ছিল। তাই ইশারায় নামায আদায় করার ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব চেয়ার ব্যবহার না করা উচিত। সম্ভবত সে কারণেই অসুস্থ ব্যক্তির বিভিন্ন বিধান আলোচনার ক্ষেত্রে চেয়ার বা উঁচু জায়গায় বসার বিষয়টি আলোচিত হয়নি। যেমনহযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন-
عن النبي قال : يصلي المريض قائما، فإن نالته مشقة صلى جالسا، فإن نالته مشقة صلى نائما يؤمي
برأسه، فإن نالته مشقة سبح্
“রাসূলুলাহ বলেন, অসুস্থ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নামায পড়বে। যদি এতে কষ্ট হয় তাহলে
বসে নামায পড়বে। যদি এতেও কষ্ট হয় তাহলে শুয়ে মাথার ইশারায় নামায পড়বে। যদি
তাতেও কষ্ট হয় তাহলে তাসবীহ পাঠ করতে থাকবে।
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রাহ. বলেন-
وكذا إذا عجز عن القعود، وقدر على الاتكاء أو الاستناد إلى إنسان أو حائط أو وسادة، لا يجزئه إلا
كذلك، ولو استلقى لا يجزه.ئ
“যদি অসুস্থ ব্যক্তি নিজের শক্তিতে বসতে অক্ষম হয়, কিন্তু কোনো কিছুর উপর ঠেস লাগিয়ে অথবা মানুষ, দেয়াল বা বালিশের সাথে হেলান দিয়ে বসতে সক্ষম হয়, তাহলে সেভাবেই নামায পড়তে হবে। যদি শুয়ে পড়ে তাহলে জায়েয হবে না।”
উল্লিখিত দলীলদ্বয়ে অসুস্থ ব্যক্তির বিভিন্ন পর্যায় ও তার বিধানের আলোচনা হয়েছে। কিন্তু
চেয়ার বা কোনো উঁচু স্থানে বসার কথা উল্লেখ হয়নি। অথচ চেয়ার তখনো ছিলো এবং উঁচু
কোনো জিনিসের ব্যবস্থাও ছিলো যা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য আরামদায়ক। কিন্তু এ বিষয়টি
আলোচনাতেই আসেনি। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, অসুস্থ ব্যক্তির জমিনে বসে নামায
আদায় করা সম্ভব হলে চেয়ারে না বসা উত্তম।
দাঁড়াতে অক্ষম কিন্তু রুকু-সিজদায় সক্ষম ব্যক্তির নামায
যে ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারে না কিন্তু রুকু-সিজদা করতে পারে। তবে লাঠি,দেয়াল বা কোনো কিছুর সাথে হেলান দিয়ে কিয়ামের পূর্ণ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাহলে তার জন্য হেলান দিয়েই দাঁড়িয়ে নামায পড়া জরুরী। বসে নামায পড়লে নামায হবে না। ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে আছে-
ولو قدر على القيام متكئا الصحيح أنه يصلي قائما متكئا، ولا يجزيه غير ذلك، وكذا لو قدر أن يعتمد
على عصا أو على خادم له، نهإف يقوم ويتكئ.
“সহীহ মত হলো, অসুস্থ ব্যক্তি যদি কোনো কিছুতে ঠেস লাগিয়ে অথবা লাঠি বা খাদেমের
কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারে, তাহলে সে সেভাবেই দাঁড়িয়ে নামায পড়বে। এছাড়া অন্য কোনোভাবে নামায পড়া জায়েয হবে না।
অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি রুকু-সিজদা করতে পারে, কিন্তু কেরাতের পূর্ণ সময় লাঠি, দেয়াল
বা অন্য কিছুর সাথে হেলান দিয়েও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, সে ব্যক্তি যতক্ষণ দাঁড়িয়ে
থাকতে পারে, ততক্ষণ দাঁড়িয়েই নামায পড়া ফরয। এমনকি তাকবীরে তাহরীমা বলতে
যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময়ও যদি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তাহলে তাকবীরে তাহরীমা
দাঁড়িয়েই বলতে হবে। তারপর যখন অপারগ হয়ে যাবে তখন বসে পড়বে। এ ধরনের
কেউ যদি প্রথম থেকেই জমিনে বসে নামায শুরু করে, তাহলে তার নামায শুদ্ধ হবে না।
আর এমন কারো জন্য চেয়ার টেবিলে বসেও নামায পড়ার সুযোগ নেই।
আল্লামা যাইনুদ্দীন ইবনে নুজাইম রাহ. বলেন-
قال الهندواني: إذا قدر على بعض القيام يقوم ذلك، ولو قدر آية أو تكبيرة ثم يقعد، وإن مل يفعل ذلك
خفت أن تفسد صلاته هذا هو المذهب، ولا يروى عن أصحابنا خلافه.
“আবু জা‘ফর আল হিন্দুওয়ানী রাহ. বলেন, যদি কিছু সময় দাঁড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে
ততটুকুই দাঁড়াবে। যদিও তা এক আয়াত বা তাকবীর বলা পরিমাণ সময় হোক না কেন।
তারপর প্রয়োজনে বসতে পারবে। যদি এমনটি না করে, তাহলে আমি আশঙ্কা করছি যে,
তার নামায নষ্ট হয়ে যাবে। আর এটি সঠিক মত। আমাদের ফুকাহায়ে কেরাম থেকে এর
বিপরীত কোনো মত বর্ণিত নেই।”
দাঁড়াতে সক্ষম কিন্তু রুকু সিজদায় অক্ষম ব্যক্তির নামায
যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নামায পড়তে সক্ষম কিন্তু রুকু-সিজদা করতে অক্ষম, অথবা রুকু করতে সক্ষম, কিন্তু সিজদা করতে অক্ষম। সে দাঁড়িয়ে বা বসে যেভাবে ইচ্ছা নামায আদায় করতে পারবে। কিন্তু উত্তম হলো, সে জমিনে বসে নামায আদায় করবে এবং ইশারায় রুকু সিজদা
করবে। এমন ব্যক্তির জন্য চেয়ারে বসে নামায পড়ারও সুযোগ রয়েছে। তবে সেটা সুন্নত
পরিপন্থী হওয়ার কারণে মাকরূহ বা অনুত্তম। যেমনআল্লামা আবুল হুসাইন আহমদ ইবনে আবু বকর আল কুদুরী রাহ. বলেন-فإن قدر على القيام، ولم يقدر على الركوع والسجود لم يلزمه القيام، وجاز أن يصلي قاعدا ئؤمي إيماء.
“যদি কেউ দাঁড়াতে সক্ষম, কিন্তু রুকু সিজদা করতে অক্ষম, তার জন্য দাঁড়ানো আবশ্যক
নয়। সে বসে ইশারায় রুকু-সিজদা করে নামায আদায় করতে পারবে।”
ইমাম আলী আল মারগীনানী রাহ. বলেন-
وإن قدر على القيام، ولم يقدر على الركوع والسجود لم يلزمه القيام، ويصلي قاعدا يومئ إيماء، لأن
ركنية القيام للتوسل به إلى السجدة لما افيه من نهاية التعظيم، فإذا كان لا يتعقبه السجود لايكون ركنا
فيتخير، والأفضل هو الإيماء قاعدا، لأنه أشبه بالسجود.
“যদি অসুস্থ ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম হয় তবে রুকু-সিজদা করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তার জন্য দাঁড়ানো আবশ্যক নয়। বরং সে বসে ইশারায় রুকু-সিজদা করে নামায আদায় করবে। কারণ, কিয়াম নামাযের রোকন হয়েছে তা সিজদায় যাওয়ার মাধ্যম হওয়ার কারণে। কেননা,এতেই সর্বোচ্চ সম্মান প্রকাশ পায়। সুতরাং যে কিয়ামের পর সিজদা থাকবে না সে কিয়ামটা রোকন হবে না। অতএব, সেক্ষেত্রে সে স্বাধীন। তবে উত্তম হলো বসে ইশারায় রুকু সিজদা করে নামায আদায় করা। কেননা, সেটা সিজদার সাথে বেশি সামঞ্জস্যশীল।”
উপরোক্ত বক্তব্যটিই হানাফী ফকীহগণের প্রসিদ্ধ মত। কিন্তু দলীলের বিচারে অনেক
মুহাক্কিক ফকীহের দৃষ্টিতে এ মাসআলায় ফিক্হে হানাফীর ঐ বক্তব্য বেশি শক্তিশালী যা
ইমাম যুফার ইবনে হুযাইল রাহ. এর মাযহাব। আর সেটিই অন্য তিন ইমাম তথা ইমাম
মালেক , ইমাম শাফে‘য়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ. প্রমুখের মাযহাব। আর তা হলো- যে ব্যক্তি জমিনের উপর সিজদা করতে অক্ষম সে যদি দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতে সক্ষম হয়, তাহলে তাকে দাঁড়িয়েই নামায আদায় করতে হবে। আর যেহেতু সে সিজদা করতে অক্ষম সেহেতু সে বসে ইশারায় সিজদা করবে। জমিনে সিজদা করতে অক্ষম হওয়ার কারণে কিয়াম ছাড়া যাবে না। কেননা কিয়াম নামাযের একটি স্বতন্ত্র ফরয। কিয়াম শুধুমাত্র
ঐ ব্যক্তির উপর ফরয নয় যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতে পারে না। তাই সিজদা
করতে অক্ষম হওয়ার কারণে কিয়াম মাফ হবে না। আল্লামা সিরাজুদ্দীন ওমর ইবনে নুজাইমরাহ. এ মতটিকেই উত্তম ও যথার্থ বলেছেন। যেমনটি তিনি “আন্ নাহরুল ফায়েকে”
উল্লেখ করেছেন-
وهذا أولى من قول بعضهم: গ্ধصلى قاعدا্র؛ إذ يفترض عليه أن يقوم للقراءة، فإذا جاء أوان الركوع والسجود
أومأ قاعدا.
“এবং এটি অর্থাৎ রুকু-সিজদার জন্য বসে ইশারা করবে- এ মতটি তাদের মত থেকে
উত্তম, যারা বলেন শুরু থেকেই বসে নামায পড়বে। কেননা, এমন ব্যক্তির জন্য কেরাতের
সময় দাঁড়িয়ে কেরাত পড়া ফরয। আর যখন রুকু-সিজদার সময় হবে, তখন বসে ইশারায় রুকু-সিজদা করবে।”
আল্লামা আহমদ ইবনে ইসমাইল আত তাহতাবী রাহ. ইবনে নুজাইম রাহ. এর কথার সমর্থন করে “মারাকিল ফালাহ” এর টিকাতে এভাবে বলেছেন-
وفي النهرما يفيد أنه عند العجز عن السجود يفترض عليه أن يقوم للقراءة، فإذا جاء أوان الركوع والسجود
يقعد ويؤمي بهما.
“আন-নাহরুল ফায়েক গ্রন্থের ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, সিজদায় অপারগ ব্যক্তি কেরাতের
সময় দাঁড়িয়ে যাবে এবং রুকু-সিজদার সময় উভয়টার জন্য বসে ইশারা করবে।”৮৫
আল্লামা ইবনুল হুমাম রাহ. এর আলোচনা থেকে উক্ত মতের সমর্থন বোঝা যায়। তিনি
‘ফাতহুল কাদীরে’ বলেন-
وقد يمنع أن شرعيته لهذا على وجه الحصر، بل له ولما فيه نفسه من التعظيم، كما يشاهد في الشاهد
من اعتباره كذلك، حتى يحبه أهل التجبر لذلك، فإذا فات أحد التعظيمين صار مطلوبا ماب فيه نفسه.
ويدل على نفي هذه الدعوى أن من قدر على القعود والركوع والسجود لا القيام، وجب القعود، عم أنه
ليس في السجود عقيبه تلك النهاية، لعدم مسبوقيته بالقيام.
“কিয়ামের বিধানটি শুধু সিজদার মাঝে সর্বোচ্চ সম্মান প্রকাশ করার জন্যই” এমনটি বলা
প্রশ্নমুক্ত নয়। বরং দাঁড়ানো থেকে সিজদায় লুটে পড়ার মধ্যে যেমন সম্মান প্রকাশিত হয়
তেমনি স্বয়ং দাঁড়ানোর মধ্যেও সম্মান প্রকাশিত হয়। দাঁড়ানোর মধ্যে যে সম্মান আছে, তা
সাক্ষীর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করা যায়। তাই তো প্রতাপশালী ব্যক্তিরা সম্মানের জন্য তাদের
সামনে দাঁড়ানোকে পছন্দ করে থাকে। সুতরাং এখন যেহেতু সিজদার মধ্যে যে সম্মান ছিল তা ছুটে গেছে, অন্তত কিয়ামের মধ্যে যে সম্মান আছে তা প্রদর্শনের জন্য কিয়ামের বিধানকে ওয়াজিব বলা হবে।
হেদায়া প্রণেতার উপরোক্ত দাবিটি এ মাসআলার দ্বারাও খন্ডিত হয়, যে ব্যক্তি কিয়াম ব্যতীতবসতে ও রুকু-সিজদা করতে সক্ষম তার উপর বসে নামায পড়া ওয়াজিব। অথচ বসা থেকে সিজদায় যাওয়ার মাঝে সেই সর্বোচ্চ সম্মান নেই, তার পূর্বে কিয়াম না থাকার কারণে।”৮৬
নিকট অতীত আলিমদের মাঝে আল্লামা যফর আহমদ উসমানী রাহ.৮৭ এ মতটিকে হাদীস
দ্বারা প্রমাণিত করে, দলীলের দিক থেকে শক্তিশালী বলেছেন। যেমনটি তিনি “ই‘লাউস
সুনানে” বলেন-
الظاهر من حديث عمران )أنه قال : كانت بي بواسير، فسألت رسول الله عن الصلاة؟ فقال :গ্صل
قائما فإن لم تستطع فعلى جنب্র. رواه البخاري.( أن القادر على القيام العاجز عن الركوع والسجود يجب
عليه القيام للقراءة، ويؤمي للركوع والسجود، لما فيه من تعليق الجواز قاعدا بشرط العجز عن القيام، ولا
عجز في هذه الصورة، ولأن القيام ركن، فلا يجوز تركه مع القدرة عليه، وبه قال زفر والشافعي رحمهما
الله كما في البدائع وهو مذهب أحمد كما في المغني قال: لم يسقط عنه القيام ويصلي قائما فيؤمي
بالركوع ثم يجلس فيؤمي بالسجود اهـ. وهو قول مالك رحمه الله كما وهذا هو الذي ذكره
في منكتبنا معشر الحنفية، فقال : يفرض عليه أن يقوم للقرءا ة، فإذا جاء أوان الركوع والسجود
أومأ قاعدا.
“ইমরান ইবনে হুসাইন রাযি. এর বর্ণিত হাদীস থেকে সুস্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম
তবে রুকু-সিজদা করতে অক্ষম তার উপর রুকু-সিজদার জন্য ইশারা করা এবং কেরাতের
জন্য দাঁড়ানো ওয়াজিব। কেননা, হাদীস শরীফে দাঁড়াতে অক্ষম হওয়ার শর্তে বসার
বৈধতাকে অনুমোদন করা হয়েছে। অথচ উপরোল্লিখিত সূরতে কোনো অক্ষমতা নেই। আর
কিয়াম হলো একটি স্বতন্ত্র রোকন। সুতরাং তা সক্ষমতা থাকা সত্তে¡ও ছেড়ে দেয়া জায়েয
নেই। এমনটি বলেছেন ইমাম যুফার রাহ.ও ইমাম শাফে‘য়ী রাহ.। আর এটাই ইমাম
আহমদ রাহ. এর মাযহাব, যেমনটি রয়েছে ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে। তিনি বলেন, এ ধরনের
ব্যক্তির জন্য কিয়াম মওকুফ হবে না। তাই সে দাঁড়িয়ে নামায পড়বে এবং ইশারায় রুকু
করবে। অতঃপর বসে ইশারায় সিজদা করবে। এটাই ইমাম মালেক রাহ. এর মাযহাব।
এটিকেই ‘আন্ নাহরুল ফায়েক’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এধরনের ব্যক্তির
উপর কেরাতের জন্য দাঁড়ানো ফরয অতঃপর রুকু সিজদা বসে ইশারায় আদায় করবে।”৮৮
তিনি আরো বলেন-
والأحوط عندي ما ذكره في গ্ধالنهر্র من وجوب القيام عليه للقراءة، وإنما الخلاف في وجوب القيام للإيماء
بالركوع والسجود، فالأفضل عندنا الإيماء بهما قاعدا، ولا يجب القيام للإيماء بواحد منهما، وعند الشافعية
ومن وافقهم يؤمي للركوع قائما وللسجود قاعدا كما مر. وهذا وإن تفرد صاحب গ্ধالنهر্র بذكره، ولم يوافقه
عليه أحد من ناقلي المذهب، ولكنه قوي من حيث الدليل، فإن ظاهر حديث عمران مؤيد له كما لا
يخفى.
“সেটিই আমার নিকট অধিক সতর্কতামূলক কথা যা ‘আন্ নাহরুল ফায়েক’ গ্রন্থে উল্লেখ
রয়েছে, অর্থাৎ ‘কেরাতের জন্য কিয়াম ওয়াজিব’। তবে ইখতেলাফ হলো ইশারার জন্য
কিয়াম ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের নিকট উত্তম হলো রুকু সিজদা উভয়টার
জন্য বসে ইশারা করবে। ইশারার জন্য কিয়াম ওয়াজিব নয়। তবে ইমাম শাফে‘য়ী৮৯,
আহমদ ও মালেক রাহ. প্রমুখের নিকট রুকুর জন্য দাঁড়িয়ে ইশারা করবে। আর সিজদার
জন্য বসে ইশারা করবে। যদিও উপরোক্ত মতটি একমাত্র “আন্ নাহরুল ফায়েক” গ্রন্থ
প্রণেতা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু দলীলের বিচারে এটিই বেশি শক্তিশালী। কেননা, ইমরান
ইবনে হুসাইন রাযি.৯০ এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসটির বাহ্যিক অর্থ থেকে এ মতটির পক্ষেই
সমর্থন পাওয়া যায়।”
পেছনে উল্লিখিত আবু জা‘ফর হিন্দুওয়ানীর বক্তব্য থেকেও এ মতটির সমর্থন পাওয়া যায়।
কারণ তাঁর বক্তব্য হলো, যে ব্যক্তি কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়াতে পারে তাকেও দাঁড়িয়ে নামায
আদায় করতে হবে। বলাবাহুল্য যে, কোনো ব্যক্তি হয়ত তাকবীরের সময়টুকুই দাঁড়াতে
পারে। রুকু পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা বরং অসুস্থতার কারণে বসতে হয়, তার দাঁড়ানো
সেজদায় সর্বোচ্চ সম্মান প্রকাশের মাধ্যম না হলেও তাকে দাঁড়াতে হবে। এখান থেকে বুঝা
যায় যে, দাঁড়ানোকে সেজদায় সর্বোচ্চ সম্মান প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই ফরয করা হয়েছে
তা সর্বাবস্থার জন্য নয়।
আল্লামা মুফতী তাকী উসমানী দা.বা.৯২ দালাইলের আলোকে এই মতটিকে শক্তিশালী
বলেছেন। এ উক্তি খন্ডন করেছেন যে, ‘শুধু সিজদার জন্য কিয়াম ফরয করা হয়েছে। তাই
সিজদা করতে অক্ষম হলে কিয়াম জরুরী থাকে না।’ এমনকি তিনি একাধিক দলীল দ্বারা এ
কথাও প্রমাণ করেছেন যে, কিয়াম নামাযের একটি স্বতন্ত্র ফরয, তা শুধু সিজদার জন্য ফরয
করা হয়েছে এমনটি নয়।
চেয়ারে বসে টেবিলে সিজদা করা
যে ব্যক্তি জমিনে সিজদা করতে অক্ষম, সে দাঁড়িয়ে হোক বা বসে ইশারা করেই সিজদা
করবে। সামনে তখতা, টেবিল, বালিশ অথবা অন্য কোনো উঁচু জিনিস রেখে তার উপর
সিজদা করবে না। কেউ যদি এমনটি করে তাহলে তা যথারীতি সিজদা বলে গণ্য হবে না।
বরং তা ইশারা হিসাবেই ধর্তব্য হবে। অতএব, সেক্ষেত্রে নামায হয়ে গেলেও নিয়ম বহির্ভূত
হওয়ার কারণে এমনটি করা উচিত নয়। কারণ, চেয়ারে বসে সামনে টেবিল ইত্যাদির উপর
কপাল রাখাকে দুই কারণে সিজদা বলা যায় না।
১. সিজদার জন্য শর্ত হলো উভয় হাঁটু জমিনে রাখা।
২. সিজদার সময় কপালের অংশ কোমরের অংশ থেকে নিচু হওয়া।
কিন্তু চেয়ারে বসে সামনে কোনো কিছুর উপর কপাল রাখলে উল্লিখিত কোনো শর্তই পাওয়া
যায় না। তাই সেটা হাকীকী সিজদা তথা নিয়মতান্ত্রিক সিজদা হিসেবে বিবেচিত হবে না।
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি. বর্ণনা করেন-
عاد رسول الله مريضا وأنا معه، فرآه يصلي ويسجد على وسادة، فنهاه وقال إن: استطعت أن تسجد
على الأرض فاسجد، وإلا فأوم إيماء، واجعل السجود أخفض من الركوع.৯৪
“রাসূলুল্লাহ এক রোগীকে দেখতে গেলেন, আমি তাঁর সাথে ছিলাম, রাসূলুল্লাহ
তাকে বালিশের উপর সেজদা দিয়ে নামায পড়তে দেখে তা করতে নিষেধ করে বললেন,
যদি জমিনে সিজদা করতে পার তাহলে জমিনেই সেজদা কর। অন্যথায় ইশারা করে নামায
পড়। তবে সেক্ষেত্রে রুকুর ইশারা থেকে সিজদার ইশারায় বেশি ঝুঁকবে।”
আল্লামা জামালুদ্দীন যায়লায়ী রাহ. বলেন-
قال رحمه الله: )ولا يرفع إلى وجهه شيئا يسجد عليه، فإن فعل( أي رفع شيئا يسجد عليه )وهو يخفض
رأسه صح( لوجود الإيماء، وقيل: هو سجود، ذكره في গ্ধالغاية্র، وكان ينبغي أن يقال: لوكان الشيء
الموضوع بحال لو سجد عليه الصحيح تجوز، جاز للمريض على أنه سجود، وإن لم يجز للصحيح أن
يسجد عليه فهو إيماء، فيجوز للمريض إن لم يقدر على السجود.
“সিজদার জন্য কোনো জিনিস চেহারার দিকে উঁচু করবে না। আর যদি কোনো জিনিস উঁচু
করে এবং সেখানে সিজদার জন্য মাথা ঝুঁকিয়ে দেয়, তাহলে তার নামায হয়ে যাবে। কেননা
এখানে ইশারা পাওয়া গেছে। মোটকথা, সে উঁচুকৃত বস্তুটা যদি এতটুকু উঁচু হয় যে, একজন
সুস্থ মানুষ তাতে সিজদা করলে তা জায়েয হয়ে যায়। তাহলে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য এটাসিজদা বলে গণ্য হবে। আর যদি সুস্থ ব্যক্তির জন্য তাতে সিজদা করা জায়েয না, তাহলে
অসুস্থ ব্যক্তির জন্য তা ইশারা হবে।”
কাতারের মাঝে বসে নামাযের বিধান
জমিনে বা চেয়ারে বসে নামায আদায়কারী লোকদের কাতারের মাঝে বা ইমামের পিছনে
নামায পড়া জায়েয। কিন্তু তাদের জন্য কাতারের কিনারায় নামায পড়া উত্তম, যাতে
কাতারের মাঝে চেয়ার রেখে বা জমিনে বসে নামায পড়ার কারণে কাতারে কোনো বক্রতা
বা শূণ্যতা দেখা না যায়। হাদীস শরীফে কাতার সোজা রাখা এবং পরস্পর খুব মিলে
দাঁড়ানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
হযরত আবু মাসউদ রাযি. বলেন-
كان رسول الله يمسح مناكبنا في الصلاة ويقول: গ্ধاستووا ولا تختلفوا، فتختلف قلوبكم. ليليني منكم
أولو الأحلام والنهى، ثم الذين يلونهم ثم الذين يلونهم্র.
“রাসূলুল্লাহ নামাজের আগে আমাদের কাঁধে হাত বুলাতেন ও বলতেন, তোমরা সোজা
হয়ে দাঁড়াও আগপিছ হয়ো না। অন্যথায় তোমাদের মাঝে অন্তর্বিবাদ সৃষ্টি হবে। তোমাদের
মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক এবং জ্ঞানী তারা আমার নিকটবর্তী দাঁড়াবে, এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যরা
দাঁড়াবে।”
তবে কেউ যদি কাতারের মাঝখানে বা ইমামের পিছনে বসে নামায পড়ে, তাহলে কারো
এই অধিকার নেই যে, সে উক্ত ব্যক্তিকে কাতারের কিনারায় চলে যাওয়ার হুকুম দেবে।
উল্লেখ্য, অধিকাংশ সময় লোকেরা জমিনে বা চেয়ারে বসে নামায আদায়কারী ব্যক্তিদের
জন্য কাতারের কিনারায় দাঁড়ানো জরুরী মনে করে থাকে, এটি সঠিক নয়।
কাতারে চেয়ার রাখার পদ্ধতি
শর‘য়ী ওযরবশত মসজিদে জামা‘আতের সাথে চেয়ারে নামায আদায়ের সময় চেয়ার রাখার
পদ্ধতি হলো- চেয়ারের পিছনের পায়া কাতারে দাঁড়ানো মুসল্লীদের পায়ের গোড়ালি বরাবর
থাকবে, যেন বসা অবস্থায় মাযূর ব্যক্তির কাঁধ অন্যান্য নামাযীদের কাঁধ বরাবর সোজা হয়ে
যায়।
আর যদি কোনো ব্যক্তি পূর্ণ নামায বসে আদায় না করে বরং দাঁড়াতে সক্ষম হওয়ার কারণে
কেরাতের সময় দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু রুকু-সিজদা করতে অক্ষম হওয়ার কারণে চেয়ারে বসে
রুকু-সিজদা আদায় করে, তাহলে এমতাবস্থায় কাতারে চেয়ার রাখার পদ্ধতি হলো- চেয়ার
এমনভাবে রাখবে যেন চেয়ারের সামনের পায়া কাতারের বরাবর থাকে আর অবশিষ্টাংশ
পিছনের দিকে থাকে। যেন দাঁড়ানোর সময় উক্ত মাযূর ব্যক্তির কাঁধ অন্যান্য নামাযীদের
কাঁধ বরাবর সোজা হয়ে যায়।
বাকী থাকলো তার পিছনের কাতারের সমস্যার কথা। তার সমাধান হলো- মাযূর ব্যক্তিরাকাতারের এক পার্শ্বে একজনের পিছনে আরেকজন বসতে থাকবে, যেন তাদের বসার কারণে
অন্যদের সমস্যা না হয়।
চেয়ারে বসে নামায পড়ার কয়েকটি ক্ষতিকর দিক
জমিনে বসে নামায আদায় করার শক্তি থাকা সত্তে¡ও চেয়ারে বসে নামায পড়ার ক্ষেত্রে
বিভিন্ন ধরনের শর‘য়ী ক্ষতি পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
১. নামাযের মধ্যে বিনয় ও নম্রতা হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য আর চেয়ারে বসে নামায আদায় করার
ক্ষেত্রে তা পূর্ণমাত্রায় পাওয়া যায় না। বসে আদায় করার সময় এর থেকে তুলনামূলক বেশি
পাওয়া যায়।
২. মসজিদে চেয়ারের আধিক্যের কারণে তা নাসারাদের গির্জা ও ইয়াহুদীদের উপাসনালয়ের
সদৃশ মনে হয়। কেননা সেখানে তারা গির্জায় চেয়ার ও বেঞ্চে বসে উপাসনা করে। আর
দ্বীনি বিষয়ে ইয়াহুদী-নাসারা ও বিজাতিদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে বারণ করা হয়েছে।
৩. চেয়ার ব্যবহারের কারণে কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। অথচ
কাতার সোজা করা ও মিলে মিলে দাঁড়ানোর ব্যাপারে হাদীস শরীফে জোর তাকিদ এসেছে।
৪. যে ব্যক্তি শরী‘আতের দৃষ্টিতে মা’যূর নয়, অর্থাৎ কিয়াম, রুকু-সিজদা করতে সক্ষম,
তার জন্য মাটিতে অথবা চেয়ারে বসে ফরয বা ওয়াজিব নামায আদায় করা কোনোক্রমেই
জায়েয নেই। এধরনের সুস্থ ব্যক্তিও সামনে চেয়ার পেয়ে চেয়ারে বসে নামায আদায় করে
নেয়। ফলে তার নামাযই হয় না।
আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে উক্ত বিধানাবলী বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন।
আমীন।।
