আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে। যাতে তোমরা খোদাভিরু হতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)
আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন,
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ
وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
পবিত্র রমজান মাসে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী রুপে আল-কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। অতএব তোমদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন রোযা রাখে। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৫)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
بني الإسلام على خمس شهادة أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله وإقام الصلاة وإيتاء الزكاة وصوم رمضان وحج البيت
ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিসের উপর। (এক) এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই এবং হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার রাসূল।(দুই) নামায প্রতিষ্ঠা করা। (তিন) যাকাত প্রদান করা। (চার) হজ¦ করা। (পাঁচ) রমযান মাসে রোযা রাখা। (তিরমিযী)
সমস্ত মুসলমান এ বিষয়ে একমত যে, প্রত্যেক প্রাপ্ত ব্যক্তির উপর রমযান মাসের রোযা ফরজ। রমজান মাসের রোযা ফরজ হওয়ার ব্যাপারে কোন মুসলমান দ্বিমত পোষণ করেনি।
রোযার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা ।শরীয়তের পরিভাষার, সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে ( পানাহার ও স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি) রোযা ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকাকে রোযা বলা হয়।
রমযানের রোযা কাদের উপর ফরজ
যার মাঝে নিন্মলিখিত শর্তসমূহ পাওয়া যাবে তার উপর রমযানের রোযা আদায় করা এবং ( আদায় করতে না পারলে) কাযা আদায় করা ফরজ।
১. সাবালক হওয়া। অতএব নাবালকের উপর রোযা ফরজ হবে না।
২. মুসলমান হওয়া। অতএব অমুসলমানের উপর রমযানের রোযা ফরজ হবে না।
৩. সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া। অতএব পাগলের উপর রোযা ফরজ হবে না।
৪. মুসলিম দেশে অবস্থান করা এবং অমুসলিম দেশে ( শত্রæভূমিতে) অবস্থান করলে রোযা ফরজ হওয়ার মাসআলা সম্পর্কে অবগত হওয়া।
রোযা রাখা কাদের উপর ফরজ??
১. মুকীমের উপর রোযা রাখা ফরজ। সুতরাং মুসাফিরের উপর রোযা রাখা ফরজ হবে না।
২. সুস্থ ব্যক্তির উপর রোযা রাখা ফরজ। সুতরাং অসুস্থ ব্যক্তির উপর রোযা রাখা ফরজ হবে না। স্ত্রীলোক যদি হায়েজ ও নেফাস থেকে মুক্ত হয় তাহলে তার উপর রোযা রাখা ফরজ। অতএব হাযেজ নেফাস গ্রস্থ মেয়েলোকের উপর রোযা রাখা ফরজ হবে না।
কখন রোযা রাখা শুদ্ধ হবে?
নিন্মলিখিত শর্তসমূহ পাওয়া গেলে রোযা রাখা শুদ্ধ হবে।
১. যে সময় রোযার নিয়ত করা শুদ্ধ সে সময় রোযার নিয়ত করা।
২. স্ত্রীলোক হায়েজ-নেফাস থেকে পবিত্র হওয়া।
৩. রোযা ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ থেকে রোযাদার মুক্ত হওয়া। যথা- পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও এগুলোর হুকুম ভুক্ত বিষয়সমূহ।
৪. রোযা শুদ্ধ হওয়ার জন্য রোযাদারের ফরজ গোসলের প্রয়োজন থেকে মুক্ত হওয়া শর্ত নয়।
রোযার প্রকারসমূহ
রোযা ছয় প্রকার। যথা-
১. ফরজ
২. ওয়াজীব
৩. সুন্নাত
৪. মুস্তাহাব
৫. মাকরুহ
৬. হারাম
প্রথম প্রকার: ফরজ রোযা। তা হলো রমযান মাসের রোযা।
দ্বিতীয় প্রকার: ওয়াজীব রোযা। যথা-
(ক) নফল রোযার কাযা যা শুরু করে নষ্ট করে দিয়েছে।
(খ) মান্নতের রোযা।
(গ) কাফফারার রোযা
নিন্মোক্ত ক্ষেত্রসমূহে কাফফারার রোযা আবশ্যক হবে।
(ক) রমজান মাসে কোন ওজর ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা নষ্ট করা।
(খ) রমজানের দিবসে ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস করা।
(গ) স্ত্রীর সঙ্গে জেহার করা।
(ঘ) কসম ভঙ্গ করা।
(ঙ) ইহরামের অবস্থায় ইহরামের পরিপন্থী কাজ করা।
(চ) ভুলবশত কাউকে হত্যা করা। তদ্রæপ যা ভুলবশত হত্যার পর্যায় ভুক্ত (কাজ করা)
তৃতীয় প্রকার: তা হলো সুন্নাত রোযা। যথা নয় তারিখ কিংবা এগারো তারিখ সহকারে আশুরার দিনের রোযা।
চতুর্থ প্রকার: মুস্তাহাব রোযা। যথা-
(ক) প্রতিমাসে যে কোন দিন তিনটি রোযা রাখা।
(খ) প্রতিমাসে আইয়ামে বীয তথা তের, চৌদ্দ ও পনের তারিখে রোযা রাখা।
(গ) প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখা।
(ঘ) শাওয়াল মাসে ছয়টি রোযা রাখা।
(ঙ) হাজীগণ ব্যতীত অন্যান্যদের আরাফার দিন রোযা রাখা।
(চ) হযরত দাউদ (আ.) এর ন্যায় রোযা রাখা। অথ্যাৎ একদিন বাদ দিয়ে একদিন রোযা রাখা। এ ধরনের রোযা রাখা উত্তম এবং আল্লাহ তায়ালার নিকট অধিক পছন্দনীয়।
পঞ্চম প্রকার: মাকরুহ রোযা। যথা-
(ক) আশুরার দিন শুধু একটি রোযা রাখা।
(খ) শুধু শনিবার দিন রোযা রাখা।
(গ) বিরতিহীন ভাবে রোযা রাখা। অথ্যাৎ সূর্যাস্তের পর পানাহার না করে আগামী দিনের রোযা গত কালের রোযার সাথে মিলিয়ে দেয়া।
ষষ্ঠ প্রকার: হারাম রোযা। যথা-
(ক) ঈদুল ফিতরের দিন রোযা রাখা।
(খ) কোরবানীর ঈদের দিন রোযা রাখা।
(গ) আইয়্যামে তাশরীক তথা জিলহজে¦র এগার, বার ও তের তারিখ রোযা রাখা।
রোযার নিয়ত করার সময়
নিয়ত করা ব্যতীত রোযা শুদ্ধ হবে না। নিয়ত করার ক্ষেত্র বা স্থান হলো অন্তর। রাত্র থেকে অর্ধ দিবসের কিছুক্ষণ পূর্ব পর্যন্ত যে কোন সময় নিয়ত করলে রোযা সহীহ হয়ে যাবে। এই বিধান নিন্মোক্ত রোযার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
১. রমযানের রোযা।
২. নির্দিষ্ট মানতের রোযা।
৩. নফল রোযা।
শুধু রোযার নিয়ত দ্বারা , কিংবা নফল রোযার নিয়ত দ্বারাও রমজানের রোযা শুদ্ধ হবে। নির্দিষ্ট মানতের রোযা শুধু রোযার নিয়ত দ্বারা, তদ্রæপ নফল রোযার নিয়ত দ্বারাও শুদ্ধ হবে। নফল রোযা শুধু রোযার নিয়ত দ্বারা, কিংবা নফল রোযার নিয়ত দ্বারা শুদ্ধ হয়ে যাবে।
রোযার নিয়ত নির্দিষ্ট করা এবং রাত থেকে রোযার নিয়ত করার শর্ত নিন্মোক্ত রোযা সমূহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
১. রমযানের কাযা রোযার ক্ষেত্রে
২. নফল রোযা নষ্ট করার পর তার কাযা আদায়ের ক্ষেত্রে।
৩. কাফফারার রোযার ক্ষেত্রে।
৪. নির্দিষ্ট মানতের রোযার ক্ষেত্রে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সহীহ ইসলামী বুঝ দান করুক এবং কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে জীবন গঠন করার তাওফীক দান করুক। আমীন
