ভূমিকা
দাম্পত্য জীবনে এমন কিছু প্রশ্ন সামনে আসে, যেগুলো ব্যক্তিগত হলেও শরঈ দিক থেকে জানা জরুরি। এর মধ্যে একটি সংবেদনশীল মাসআলা হলো—স্বামী যদি স্ত্রীর বুকের দুধ পান করে ফেলে, তাহলে শরঈভাবে এর হুকুম কী?
এতে কি নিকাহ ভেঙে যায়? দুধ-সম্পর্ক (রিদাআত) সৃষ্টি হয় কি না? এটি হারাম, না মাকরূহ?
এই প্রবন্ধে আমরা ফিকহে হানাফির গ্রহণযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
মূল প্রশ্ন
স্বামী যদি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রীর দুধ পান করে—
-
কি রিদাআত সাব্যস্ত হবে?
-
নিকাহ বাতিল হবে কি?
-
এটি শরঈভাবে হারাম, না মাকরূহ?
-
কাফফারা বা তাওবা প্রয়োজন আছে কি?
প্রথমত: রিদাআত (দুধ-সম্পর্ক) কি সাব্যস্ত হবে?
হানাফি মাজহাবের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত
স্বামী স্ত্রীর দুধ পান করলে কোনোভাবেই রিদাআত সাব্যস্ত হয় না।
কারণ
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী রিদাআত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য দুটি শর্ত আবশ্যক—
-
দুধপানকারীকে শিশু হতে হবে
-
শিশুর বয়স হতে হবে আড়াই বছর (৩০ মাস) এর কম
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে যদি সে স্ত্রীর দুধ পান করে—রিদাআত সাব্যস্ত হয় না।
দলিল
الهدایة
والرِّضاعُ لا يثبتُ إلا في الصِّغر
“রিদাআত কেবল শিশুকালেই সাব্যস্ত হয়।”
📘 আল-হিদায়া, কিতাবুর রিদাআ
দ্বিতীয়ত: এতে কি নিকাহ ভেঙে যায় বা স্ত্রী হারাম হয়?
শরঈ সিদ্ধান্ত
👉 নিকাহ ভাঙে না এবং স্ত্রী স্বামীর জন্য হারামও হয় না।
কারণ—
-
যেহেতু রিদাআত সাব্যস্ত হয়নি
-
কোনো নতুন মাহরাম সম্পর্ক তৈরি হয়নি
অতএব নিকাহ পূর্বের মতোই বহাল থাকবে।
দলিল
بدائع الصنائع
ولو شرب الكبير لبن امرأة لا يثبت به التحريم
“যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো নারীর দুধ পান করে, তাহলে তার দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয় না।”
📘 বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৩
তৃতীয়ত: দুধ পান করার শরঈ হুকুম—হারাম না মাকরূহ?
হানাফি মাজহাবের গ্রহণযোগ্য মত
👉 স্বামীর জন্য স্ত্রীর দুধ পান করা হারাম নয়, তবে মাকরূহ।
কেন মাকরূহ?
-
মানুষের দুধ মূলত শিশুর খাদ্য
-
প্রাপ্তবয়স্কের জন্য এটি গ্রহণ স্বভাবগতভাবে অপছন্দনীয়
-
শালীনতা ও রুচির পরিপন্থী
দলিল
الدر المختار
ويكره شرب لبن الآدمية
“মানুষের দুধ পান করা মাকরূহ।”
📘 আদ-দুররুল মুখতার
رد المحتار
لأنه مستقذر طبعًا
“কারণ এটি স্বভাবগতভাবেই ঘৃণিত।”
📘 রদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদীন)
চতুর্থত: ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত অবস্থার পার্থক্য
▪ অনিচ্ছাকৃত হলে
-
কোনো গুনাহ নেই
-
শুধু মাকরূহ হিসেবে গণ্য হবে
▪ ইচ্ছাকৃত হলে
-
গুনাহের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে
-
তাওবা ও ইস্তিগফার করা উত্তম
তবে উভয় ক্ষেত্রেই—
❌ নিকাহ ভাঙে না
❌ স্ত্রী হারাম হয় না
পঞ্চমত: কাফফারা বা তাওবার বিধান
-
কোনো নির্দিষ্ট কাফফারা নেই
-
তবে ইচ্ছাকৃত হলে—
-
আল্লাহর কাছে তাওবা করা
-
ভবিষ্যতে এ কাজ থেকে বিরত থাকা উত্তম
-
সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত (Key Takeaways)
| বিষয় | হুকুম |
|---|---|
| স্বামী স্ত্রীর দুধ পান | মাকরূহ |
| রিদাআত সাব্যস্ত | ❌ না |
| নিকাহ ভাঙে | ❌ না |
| স্ত্রী হারাম হয় | ❌ না |
| কাফফারা | ❌ নেই |
| তাওবা | ✔ উত্তম |
উপসংহার
ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্ককে সহজ ও স্বচ্ছ রাখা হয়েছে। কিছু সংবেদনশীল বিষয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা থাকলেও ফিকহে হানাফির আলোকে স্বামী স্ত্রীর দুধ পান করলে নিকাহ বা সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হয় না—তবে শালীনতা ও তাকওয়ার খাতিরে এ ধরনের কাজ পরিহার করাই উত্তম।
