দাড়ি ও চুলের শরয়ী বিধান

 দাড়ি ও চুলের শরয়ী বিধান



প্রত্যেক জাতি ও ধর্মের বিশেষ কিছু নিদর্শন থাকে, যা উক্ত ধর্মের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ইসলামের অন্যতম নিদর্শন হলো দাড়ি, যা হযরত মুহাম্মদ সহ সকল নবীর আদর্শ ও সুন্নাত। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ এর চুল যেমন ছিলো, তেমনিভাবে চুল রাখা আমাদের কর্তব্য। সর্বোপরি জীবনের সকল ক্ষেত্রে চুল, দাড়িসহ তাঁর সুন্নত ও আদর্শ খুঁজে বের করা এবং সে সকল আদর্শে আদর্শবান হওয়া আমাদের জন্য অপরিহার্য। তাই দাড়ি ও চুলের ব্যাপারে নববী আদর্শ এবং ইসলামের নীতিমালা ও বিধানাবলী কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিতভাবে নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

কুরআনের আলোকে দাড়ি

পূর্বযুগের নবীদের দাড়ি ছিলো এবং তা লম্বাও ছিলো। এ কথার প্রমাণ কুরআনে কারীমে পাওয়া যায়। যেমন হযরত হারুন আ. হযরত মূসা আ. কে সম্বোধন করে বলেছেন-

لا تأخذ بلحيتي

“তুমি আমার দাড়ি ধরো না।”

হযরত হারুন আ. এর দাড়ি এত লম্বা ছিল যা ধরার উপযুক্ত অর্থাৎ এক মুষ্টি পরিমাণ ছিল। তাফসীর বিশারদগণ দাড়ি মুন্ডানোকে আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আর সৃষ্টির মাঝে পরিবর্তন করা অভিশপ্ত শয়তানের কাজ। কুরআনে কারীমে শয়তানের কতিপয় প্রতিশ্রæতি উল্লেখ করে বলা হয়েছে-

و لامرنهم فليغيرن خلق الله

“অবশ্যই আমি (শয়তান) তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করবো,তারা যেন আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতিকে পরিবর্তন করে।”

উক্ত আয়াতের তাফসীরে হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানভী রাহ. ‘বয়ানুল কুরআনে’ লিখেন-

“আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতির পরিবতর্ ন সাধন ফাসেকী কাজসমূহের অš Íভর্ ুক্ত। যেমন দাড়ি মুÐন করা, শরীর কেটে বা খোদাই করে কিছু অংকন করা প্রভৃতি।” একবার এক ব্যক্তি হযরত থানভী রাহ. কে জিজ্ঞাসা করলো যে, পুরো কুরআন শরীফের কোন জায়গায় দাড়ি রাখা বা মুন্ডানো সম্পর্কে কোন আলোচনা নেই। তার জবাবে তিনি কুরআনের উক্ত আয়াত পড়ে বললেন, আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, দাড়ি মুন্ডানো গুনাহ ও শয়তানী কাজ সমূহের অন্তর্ভুক্ত। মোটকথা, দাড়ি মুন্ডানো হারাম হওয়ার বিষয়টি কুরআন থেকেও প্রমাণিত।

হাদীসের আলোকে দাড়ি

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

قال رسول الله  خالفوا المشركين ووفروا اللحى، واحفوا الشوارب.

“নবী কারীম ইরশাদ করেন, তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধাচরণ কর। (আর তা এভাবে যে) দাড়ি লম্বা কর এবং গোঁফ কর্তন কর।”  অনুরূপভাবে ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

قال رسول الله  : أنهكوا الشوارب، وأعفوا اللحى

“রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন, গোঁফ ভালভাবে খাটো কর আর দাড়ি বাড়াও।”হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, আরেকটি হাদীসে আছে-

أن رسول الله  قال إن: فطرة الإسلام الغسل يوم الجمعة، والاستنان، وأخذ الشارب، وإعفاء اللحى

فإن المجوس تعفي شواربها وتحفي لحاها، فخالفوهم، حدوا شواربكم وأعفوا لحاكم

“রাসূলুল্লাহ বলেন, নিশ্চয় ইসলামের স্বভাব হলো শুক্রবারে গোসল করা, মিসওয়াক করা, মোচ কাটা, দাড়ি লম্বা রাখা। কেননা অগ্নিপূজকরা মোচ লম্বা রাখে আর দাড়ি খাটো করে। সুতরাং তোমরা তোমাদের মোচ খাটো করে এবং দাড়ি লম্বা রেখে তাদের বিরোধিতা কর।”

উক্ত হাদীসসমূহের মর্মার্থ হলো, মোচ ছোট করা ও দাড়িকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেয়া। এছাড়া উসূলে ফিক্হের কিতাবে আছে যে, জুমহুর ওলামায়ে কেরামের মতে আমরের সীগা (আদেশসূচক ক্রিয়া) ওয়াজিবের জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার আলামত পাওয়া না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ওয়াজিবই উদ্দেশ্য হবে। আর যদি ওয়াজিবের অর্থে ব্যবহারের আলামত থাকে, তাহলে তো ওয়াজিবের অর্থই নির্ধারিত হবে।

প্রকাশ থাকে যে, উক্ত হাদীসসমূহে আদেশসূচক ক্রিয়া ওয়াজিবের অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার আলামত হলো, হযরত ইবনে ওমর রাযি. এর নিম্নোক্ত উক্তি-

اأمرن بإعفاء الشوارب وإعفاء اللحى

“রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে গোঁফ কর্তন করার ও দাড়ি বৃদ্ধি করার নির্দেশ দিয়েছেন।” 

ইমাম নববী রাহ. বলেন-

) وأما إعفاء اللحية( فمعناه توفيرها وهو معنى )أوفوا اللحى في( الرواية الأخرى، وكان ع من ادة الفرس قص

اللحية فنهى الشرع عن ذلك... فحصل خمس روايات : أعفوا وأوفوا وأرخوا وأرجوا ووفروا ، ومعناها كلها

: تركها على حالها. هو هذا الظاهر من الحديث الذي تقتضيه ألفاظه“ إعفاء اللحية

এর অর্থ হলো, দাড়ি বৃদ্ধি করা। অন্য রেওয়ায়েতে أوفوا اللحى এর অর্থও এটাই। পারস্যবাসীদের অভ্যাস ছিলো, দাড়ি ছাঁটা। শরী‘আত এ থেকে নিষেধ করেছে।... দাড়ি সম্পর্কে মোট পাঁচটি রেওয়ায়েত পাওয়া গেলো, ।أعفوا، أوفوا، وأرخوا، وأرجوا ووفرو ا

সবগুলো রেওয়ায়েতের অর্থ একই, দাড়িকে নিজ অবস্থায় ছেড়ে দেয়া। হাদীসের শব্দ থেকে এ অর্থই সুস্পষ্ট।” 

ইজমায়ে উম্মত ও দাড়ি মুন্ডানো

চার মাযহাবের ইমামগণ এ ব্যাপারে একমত যে, দাড়ি রাখা ও বৃদ্ধি করা ওয়াজিব আর মুন্ডানো হারাম। শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহ. বলেন-

وقد اتفقت المذاهب الأربعة على وجوب توفير اللحية وحرمة حلقها

“চার মাযহাবের ইমামগণ দাড়ি বৃদ্ধি করা ওয়াজিব ও দাড়ি মুন্ডানো হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত।”৯৮৭ হাফেজ ইবনে কাছির রাহ. এর রচিত ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থের একটি শিরোনাম এরূপ-

الأمر بإلزام القلندرية بترك لحاهم وحواجبهم وشوارحهم، وذلك محرم بالإجماع্

“কালান্দারিয়া গোত্রের লোকজনের উপর দাড়ি, ভ্র ও গোঁফ না মুন্ডানোর নির্দেশ, যা উম্মতের ইজমার ভিত্তিতে হারাম।

এ ব্যাপারে আল্লামা মাহমুদ খাত্তাবী রাহ. বলেন-

فلذا كان حلق اللحية محرما عند أئمة المسلمين المجتهدين، أبي حنيفة ومالك والشافعي وأحمد وغيرهم

“মুসলমানদের মুজতাহিদ ইমামগণ তথা ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফে‘য়ী ও ইমাম আহমদ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখের মতে দাড়ি মুন্ডানো হারাম।” ইমাম ইবনুল হুমাম রাহ. বলেন-

وأما الأخذ منها وهي دون ذلك، كما يفعله بعض المغاربة ومخنثة الرجال، فلم يبحه أحد

“একমুষ্টির ভেতরে দাড়ি কর্তন করা কারো মতেই জায়েয নেই। যেমনটি করত কতিপয়পাশ্চাত্যবাদী ও মহিলাদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণকারী পুরুষ।”৯৯০অতএব এক মুষ্টির ভেতরে দাড়ি কাটা যখন কারো মতে জায়েয নেই, সেখানে দাড়ি মুন্ডানো

যে সবার মতেই হারাম হবে তা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট। একারণেই হাকীমুল উম্মতহযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ. বলেছেন-

قلت لم) قوله يبحه أحد( نص في الإجماع فقط

“আল্লামা ইবনুল হুমাম ও আলাউদ্দীন হাসকাফী রাহ. এর বাণী ( لم يبحه أحد তথা কারো মতেই বৈধ নয়) দাড়ি মুন্ডানো হারাম হওয়ার উপর সবাই যে একমত, এ কথার প্রমাণ বহন করে।”

মুফ্তী শফী রাহ. এক প্রশ্নের উত্তরে লিখেন-

“উম্মতের ইজমা তথা ঐক্যমতের ভিত্তিতে দাড়ি মুন্ডানো হারাম।”

ইবনে হাযম যাহেরী রাহ. লিখেন-

واتفقوا أن حلق جميع اللحية مثلة، لا تجوز

“সবাই একথার উপর একমত যে, সম্পূণর্  দাড়ি মুন্ডানো মুছলা তথা ‘আকৃতির বিকৃতিসাধন’ যা বৈধ নয়।”

দাড়ির পরিমাণ

আমরা দাড়ি সম্পর্কীয় হাদীস দ্বারা পূর্বেই অবগত হয়েছি যে, রাসূল থেকে দাড়ি লম্বা করা ও ছেড়ে দেয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়, কিন্তু এক মুষ্টির পর দাড়ি কাটার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ থেকে সরাসরি কোন গ্রহণযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় না।৯৯৪ তবে প্রসিদ্ধ সাহাবী ইবনে ওমর রাযি. এক মুষ্টির পরে দাড়ি কাটলে রাসূল তাকে নিষেধ করেননি। আর নিষেধ না করাটাই ইলমে হাদীসের পরিভাষা অনুযায়ী ‘তাকরীর’ তথা মৌন সমর্থন হিসেবে গণ্য হবে। কোন কোন কাজের ক্ষেত্রে রাসূল এর সমর্থনও হাদীস হিসেবে গণ্য হয়। সুতরাং এক মুষ্টির অতিরিক্ত দাড়ি কাটাও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। উল্লেখ্য যে, কেউ যদি এক মুষ্টির উপর দাড়ি লম্বা করতে অনিচ্ছুক হয়, তাহলে তার জন্য দাড়ি কাটার সুযোগ আছে। ইমাম আবু হানীফা রাহ. ও ইমাম মুহাম্মদ রাহ. এর মতামতও তাই। যেমনটি ইমাম মুহাম্মদ রাহ. ইমাম আবু হানীফা রাহ. এর সূত্রে হযরত ইবনে ওমর রাযি. এর কর্মগত হাদীসটি বর্ণনা করে মন্তব্য করেন-

عن ابن عمر أنه كان يقبض على لحيته ثم يقص ما تحت القبضة، قال محمد: وبه نأخذ هوو قول

أبي حنيفة رحمه

“ইবনে ওমর রাযি. স্বীয় দাড়ি হাতের মুঠোতে ধরতেন এবং মুঠোর বাইরের অংশ কর্তন করতেন। ইমাম মুহাম্মদ রাহ. বলেন, আমরা এই মতটিই গ্রহণ করেছি আর এটা আবু হানীফা রাহ. এরও মত।” 

ইমাম আলী আল-মারগীনানী রাহ. সুন্নাত পরিমাণ দাড়ির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এক মুষ্টির দ্বারা। যেমনটি তিনি স্বীয় কিতাব হেদায়া’তে লিখেন-

ولا يفعل لتطويل اللحية، إذا كانت بقدر المسنون وهو القبضة

“যদি দাড়ি সুন্নত পরিমাণ হয়, তাহলে দাড়ি লম্বা করার উদ্দেশ্যে কোন ঔষধ ব্যবহার করবে না। আর সুন্নত পরিমাণ হলো এক মুষ্টি।”

ইমাম নববী রাহ. এক মুষ্টি দাড়ির ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরামের মতামত বর্ণনা করতে গিয়ে ইমাম গাযালী রাহ.  এর উক্তি এভাবে নকল করেন-

اختلف السلف فيما من طال اللحية، فقيل لا: بأس أن يقبض عليها ويقص ما تحت القبضة، فعله ابن

عمر، ثم جماعة من التابعين، واستحسنه الشعبي وابن سيرين

“দাড়ির লম্বা অংশটুকুর ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ বলেছেন, দাড়িগুলো মুঠে নিয়ে মুষ্টির অতিরিক্ত দাড়ি কর্তন করায় কোন অসুবিধা নেই। ইবনে ওমর রাযি. এবং তাবিয়ীনদের এক জামা‘আত তাই করেছেন। ইমাম শা‘বী ও ইবনে সীরীন রাহ.ও এটাকে পছন্দ করেছেন।”

পুরুষের চুলের বিধান

রাসূলুল্লাহ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের চুল রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. বর্ণনা করেন-

كان شعر رسول الله  إلى نصف أذنيه

“রাসূল এর চুল মুবারক দুই কানের মধ্যভাগ পর্যন্ত লম্বা ছিলো।”  অন্য বর্ণনাতে এসেছে

عن قتادة : قال قلت لأنس : كيف كان شعر رسول الله  ؟ لم: قال يكن بالجعد، ولا بالسبط

كان يبلغ شعره شحمة أذنيه

“হযরত কাতাদা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হযরত আনাস রাযি. কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ এর চুল মুবারক কেমন ছিলো? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ এর চুল মুবারক অত্যাধিক কোকড়াঁনোও ছিলো না আবার একেবারে সোজাও ছিলো না;

বরং তার চুল মুবারক কানের লতি পর্যন্ত পৌঁছত।”

হযরত আয়েশা রাযি. বলেন-

كنت أغتسل أنا ورسول الله  من إناء واحد، وكان له شعر فوق الجمة ودون الوفرة

“আমি এবং রাসূলুল্লাহ একই পাত্র থেকে (অর্থাৎ একই পাত্রের পানি দিয়ে) গোসল করতাম, তার চুল মুবারক জুম্মা থেকে কম ও ওয়াফ্রা থেকে বেশি ছিলো।”

বি.দ্র. জুম্মা: মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত রাখাকে জুম্মা বলা হয়।

ওফরা: মাথার চুল কানের লতি পর্যন্ত রাখাকে ওফরা বলা হয়।

লিম্মা: মাথার চুল কানের লতি ও কাঁধের মাঝ বরাবর রাখাকে লিম্মা বলা হয়।

উল্লিখিত হাদীসসমূহ দ্বারা রাসূল এর তিন প্রকারের চুল রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই ফুকাহায়ে কেরাম এ তিন প্রকারের চুল রাখাকে সুন্নাত অভিহিত করেছেন। চুল রাখার আরেকটি পদ্ধতি হলো (কছর) অর্থাৎ মাথার চুল চতুর্দিকে সমানভাবে ছেটে রাখা। সুতরাং সামনে লম্বা পিছনে খাটো করে বিদেশী ফ্যাশনে চুল রাখা থেকে বেঁচে থাকা উচিত।

হলকের বিধান

রাসূলুল্লাহ থেকে হজ্ব-ওমরা ব্যতীত মাথার চুল হলক করার রেওয়ায়েত পাওয়া যায় না। যেমন ইমাম মুহিউদ্দীন নববী রাহ. লিখেন-

فلم يصح ان النبي  في إلا حلق الحج والعمرة

“নবী কারীম হজ্ব-ওমরা ছাড়া হলক করেছেন এমন কোন সঠিক প্রমাণ নেই।” তাছাড়া খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্য হতে তিন খলীফা- হযরত আবু বকর, হযরত ওমর ও হযরত উসমান রাযি. থেকেও হজ্ব-ওমরা ব্যতীত মাথা মুন্ডানোর কোনো রেওয়ায়েত পাওয়া যায় না। যেমন হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ফকীহ মোল্লা আলী কারী রাহ. احلقوا

- হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন 

كله واتركوا كله

)احلقوا أي( كله : كل الرأس أي شعره... فيه إشارة أن إلى الحلق في غير الحج والعمرة جائز، أنو الرجل

مخير بين الحلق وتركه، لكن الأفضل لا أن يحلق في إلا أحد النسكين، كما كان عليه السلا مع م

أصحابه ، وانفرد منهم علي كرم الله وجهه

“রাসূলুল্লাহ এর বাণী -ে احلقوا كله واتركوا كله ত হজ্ব-ওমরা ছাড়া মাথা মুন্ডানো জায়েয হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। আর পুরুষদের জন্য চুল রাখা ও হলক করা উভয়েরই সুযোগরয়েছে। তবে হজ্ব এবং ওমরা ব্যতীত অন্য সময় মাথা না মুন্ডানো উত্তম। যেমনটি ছিলো নবী কারীম ও সাহাবায়ে কেরামের আমল। শুধু হযরত আলী রাযি. এর ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি হজ্ব-ওমরা ছাড়া অন্য সময়ও হলক করতেন।”১০০৩ সুতরাং ‘হলক’ এবং ‘কছর’ সম্পর্কে উল্লিখিত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পুরুষের

জন্য ‘হলক’ আর ‘কছর’ এর মধ্যে ইখতিয়ার রয়েছে। তবে আল্লামা শামী রাহ. হলক সুন্নত হওয়ার পক্ষে একটি বক্তব্য এভাবে উল্লেখ করেন-

وفي الروضة: للزندويستي أن السنة في شعر الرأس، إما َ الفرق أو الحلق

“যানদাবীস্তী রাহ. এর রচিত কিতাব রওজাতুল ওলামাতে উল্লেখ আছে, মাথার চুলের ব্যাপারে সুন্নাত হলো সমানভাবে চুল ছাঁটা বা মুন্ডানো।”১০০৪ ‘কছর’ এর ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো, চতুর্দিকে সমানভাবে চুল কাটাবে। অন্যথায় হাদীস দ্বারা প্রমাণিত তিন পদ্ধতির কোন এক পদ্ধতিতে রাখবে। মনে রাখতে হবে ‘হলক’ করতে গিয়ে ( قزعঅর্ধ মুÐন) যেন না হয়। অর্থাৎ এমন যেন না হয় মাথার কিছু অংশ মুন্ডানো হলো আর কিছু অংশ রেখে দেয়া হলো। কেননা ফুকাহায়ে কেরাম এভাবে চুল মুন্ডানো মাকরূহে

তাহরীমী বলেছেন। যেমন আল্লামা শামী রাহ. বলেন-

ويكره القزع أن وهو يحلق البعض ويترك البعض قطعا مقدار ثلاثة أصابع

“কুযা মাকরূহে তাহরীমী। আর ‘কুযা’ বলা হয় মাথার কিছু চুল রেখে বাকি চুল মুন্ডানো।”

মহিলাদের চুলের বিধান

মহিলাদের চুলের ক্ষেত্রে মৌলিক নীতিমালা হলো তারা চুল রাখবে, মুন্ডাবে না। কেননা মহিলাদের সৌন্দর্য হলো লম্বা চুল। অতি প্রয়োজনে যদি কাটতে হয়, তাহলে অবশ্যই নিম্নোক্ত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হবে।

এক. অমুসলিম নারীদের অনুসরণের উদ্দেশ্যে মাথার চুল ছেটে খাটো করতে পারবে না। কেননা হাদীস শরীফে ভিন্ন ধর্মীয় নারীদের অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

দুই. চুল কাটতে গিয়ে এ পরিমাণ খাটো করবে না যে, তা পুরুষের বাবরী চুলের মত হয়ে যায়। কারণ হাদীস শরীফে পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করতেও নিষেধ করা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন-

لعن رسول الله  المتشبهات بالرجال من النساء والمتشبهين بالنساء من الرجال

“রাসূলুল্লাহ পুরুষদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণকারী মহিলা ও মহিলাদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণকারী পুরুষদের উপর অভিশাপ করেছেন।”

উল্লিখিত দু’টি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে নারীরা প্রয়োজনে মাথার চুল কিছু পরিমাণ কাটতে বা মুন্ডাতে পারবে। যেমন কোন জটিল রোগের কারণে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা হিসেবে মাথা মুন্ডানো তাদের জন্য জায়েয। আল্লামা ইবনে নুজাইম রাহ. বলেন-

الضرورات تبيح المحذورات

“একান্ত প্রয়োজন (অপারগতায়) অবৈধ কাজও বৈধ হয়ে যায়।”

কর্তিত চুল বিক্রির বিধান

বর্তমানে কিছু মুসলিম নারী বিজাতীয় নারীদের কৃষ্টি-কালচারে প্রভাবিত হয়ে মাথার চুল বিক্রি করে থাকে, যা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ। সুতরাং সামান্য পয়সার জন্য এমনটি করা মারাত্মক গুনাহ। ফিকহ শাস্ত্র তথা ইসলামী আইনের আলোকে মানুষ ও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন হওয়ায় তা ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আল্লামা

আলাউদ্দীন হাসকাফী রাহ. বলেন-

بطل بيع... وشعر الإنسان لكرامة الآدمي ولو كافرا

“মানবজাতির সম্মানের কারণে তাদের চুল বিক্রি সহীহ হবে না, যদিও চুল কাফেরের হোক না কেন।” 

অনুরূপভাবে ইমাম আলী আল মারগীনানী রাহ. বলেন-

لا يجوز ش بيع عور الإنسان ولا الانتفاع به، لأن الآدمي مكرم، لا مبتذل، فلا يجوز أن يكون شيء من

أجزائه مهانا مبتذلا، قال عليه الصلاة والسلام: لعن الله الواصلة والمستوصلة

“মানুষের চুল ক্রয়-বিক্রয় ও তা থেকে উপকৃত হওয়া উভয়টি নাজায়েয। কেননা মানবজাতি সম্মানের পাত্র; ব্যবহারের পাত্র নয়। তাই তার কোন একটি অঙ্গও অসম্মানিত ও ব্যবহারযোগ্য হতে পারে না। রাসূল ইরশাদ করেন, অন্যের চুল সংযোজনকারী ও

তার সহযোগী উভয়ের উপরই আল্লাহর অভিসম্পাত।”

মহিলাদের দাড়ি-গোঁফের বিধান

মহিলাদের দাড়ি-মোচ গজালে তা মুÐিয়ে ফেলা শুধু জায়েযই নয় বরং তা মুস্তাহাব। আল্লামা শামী রাহ. বলেন-

وفي تبيين المحارم: إزالة الشعر من الوجه إذا إلا حرام نبت للمرأة لحية أو شوارب فلا تحرم إ بل زالته تستحب اهـ  .

“চেহারা থেকে দাড়ি মুন্ডানো হারাম, কিন্তু যখন মহিলার মুখে দাড়ি বা মোচ গজায় তখন তা মুন্ডানো জায়েয বরং মুস্তাহাব।


শরয়ী দলীল: সূরা ত্বহা: ৯৪ , সূরা নিসা: ১১৯, বয়ানুল কুরআন: ১/৪০৫, মাকতাবাতুল ইত্তেহাদ, দেওবন্দ ,  সহীহ বুখারী: হাদীস নং ৫৮৯২ ,  সহীহ বুখারী: ২/৮৭৫ সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদীস নং ১২২১, সহীহ মুসলিম: ১/১২৯ , শরহু মুসলিম, নববী: ১/১২৯, মাকতাবায়ে আশরাফিয়া, দেওবন্দ ,  দাড়হী কা উজুব: ২,  আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১৪/৩১৪, আল্ মানহাল শরহু সুনানি আবী দাউদ: ১/২৮৬, ফাতহুল কাদীর: ২/২৭০, মাকতাবায়ে রশীদিয়া, কোয়েটা, পাকিস্তান ,  বাওয়াদিরুন নাওয়াদির: ২/ ৪৪৩, কুতুবখানা রহীমিয়া, দেওবন্দ ,  জাওয়াহিরুল ফিক্হ: ৭/১৫৯, মাকতাবায়ে দারুল উলূম করাচী, পাকিস্তান, মারাতিবুল ইজমা: ১/১১৯ মিরকাত: ৮/২১৬, আল মাকতাবাতুল হাবীবিয়্যা, পাকিস্তান  ফাতাওয়ায়ে শামী: ৯/৫৮৪, মাকতাবায়ে যাকারিয়া, দেওবন্দ ,  ফাতাওয়ায়ে শামী: ৫/২৮৯; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৫/৩৫৭, মাকতাবায়ে যাকারিয়া, দেওবন্দ, 

তথ্যসূত্র: দরসুল ফিক্হ


1 Comments

  1. আলহামদুলিল্লাহ, অনেক কিছু জানা গেল

    ReplyDelete
Post a Comment
Previous Post Next Post